
বিশ্ব震ড়িত এপস্টেইন কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আলোচনায় সরব। ঠিক সেই সময় দেশে প্রকাশ পায় এক হৃদয়বিদারক ও নির্মম ঘটনা—রাজধানীর একটি বাসার ভেতর ১১ বছর বয়সী শিশু গৃহকর্মী মোহনার ওপর দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নির্যাতনের চিত্র। এটি কোনো আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারি নয়, কোনো গোপন দ্বীপ নয়; বরং সাধারণ শহরের একটি বাসার চারপাশে ঘটে চলেছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এমডি ও সিইও মো. সাফিকুর রহমানের উত্তরার বাসায় কাজ করা মোহনার শরীরজুড়ে আঘাত, পোড়া ক্ষত এবং নির্যাতনের চিহ্ন দেখে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, এ চিহ্নগুলো একদিনের নয়, বরং ধারাবাহিক নির্যাতনের প্রমাণ বহন করে।
ঘটনা জানার পর মোহনার বাবা শিশুনির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন। ১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ৩:৩৫ মিনিটে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে সাফিকুর রহমান ও তার স্ত্রীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তাদের আদালতে পাঠানো হয় এবং কারাগারে প্রেরণ করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে দু’জন ছিলেন বাসার গৃহকর্মী, যাদের সন্তানদের সাথেও কারাগারে পাঠানো হয়।
সরকার subsequently সাফিকুর রহমানের নিয়োগ বাতিল করে এবং দায়িত্ব প্রদান করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. হুমায়রা সুলতানাকে।
মামলায় মোহনার বাবা জানান, তার মেয়ে গত বছরের জুনে বাসায় কাজের জন্য দেওয়া হয়েছিল। ২ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি মেয়েকে সুস্থ দেখেছেন, কিন্তু এরপর তাকে দেখা করতে গেলে পরিবার বিভিন্ন অজুহাতে বাধা দেয়। ৩১ জানুয়ারি শিশুটিকে অসুস্থ বলে আনা হয়, এবং দেখা যায় তার দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ গুরুতর জখম। মোহনা জানায়, ২ নভেম্বরের পর থেকে তাকে নিয়মিত মারধর ও খুন্তি দিয়ে পোড়া করা হয়।
এই ঘটনা বাংলাদেশের শিশু গৃহকর্মীদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে। শিশুদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নজরের বাইরে রাখা হয়, যেখানে নির্যাতন সর্বাধিক ভয়ংকরভাবে সংঘটিত হয়। মানবাধিকারকর্মীরা বলেন, এমন নির্যাতন ঘটে ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে, যেখানে ক্যামেরা নেই, প্রতিবেশীর চোখ নেই, নিয়মিত তদারকি নেই।
ঘটনার সবচেয়ে ব্যথিত বিষয় হলো অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয়। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী, যিনি শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার কথা বললেও তার বাসাতেই ঘটে এই নির্যাতন। সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অপরাধ করে, আর নির্যাতিতরা শিশু বা দরিদ্র। এই দ্বৈত চরিত্র সমাজে সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ অপরাধীকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়, এবং নির্যাতন নীরবতার আড়ালে ঘটে।
শিশু গৃহকর্মীরা সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল—খাবার, ঘুম, চিকিৎসা, এমনকি বাঁচার অধিকার অন্যের ওপর। সমাজ যখন শিশু শ্রমকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেয়, তখন নির্যাতনও স্বাভাবিক হয়ে যায়। প্রতিবেশী জানলেও কেউ প্রশ্ন তোলে না।
এই নীরবতা অপরাধীর সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রকাশ্যে আসা ঘটনা খুবই কম, কিন্তু অগণিত শিশু অদৃশ্যভাবে নির্যাতিত হয়। এই ঘটনায় সমাজের দায়িত্ব উঠে আসে—কাদের আমরা বিশ্বাস করি, কাদেরকে আমরা নিরাপদ মনে করি, আর যাদের যন্ত্রণার দিকে চোখ বন্ধ রাখি। এই প্রশ্ন না করলে এমন ঘটনা বারবার ঘটবে।
এপস্টেইন ফাইল যেমন দেখায় ক্ষমতাশীলরা দুর্বলদের কণ্ঠ বন্ধ করে রাখে, এই ঘটনা তেমনি আমাদের সমাজের আয়না ধরিয়ে দেয়। ন্যায়বিচার বড় বা ছোট নয়—শুধু হয়, অথবা হয় না।
মন্তব্য (0)
প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।