প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ, পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক স্তরে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন এবং মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫০১ জন শিক্ষক রয়েছেন। মেধাভিত্তিক শিক্ষকতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে এবং শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য নিয়েও কাজ করছে সরকার।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, প্রকৃত মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের আধুনিক ও স্মার্ট দক্ষতায় রূপান্তরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সব স্তরের শিক্ষকদের পেশাগত সক্ষমতা বাড়াতে নেওয়া কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শিক্ষাবিদরা শিক্ষকদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে, প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা ও উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা সহজ হবে।

মাধ্যমিকে স্মার্ট ক্লাসরুম ও বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ (লেইস) প্রকল্পের আওতায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ৫৬৬ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ২৬ হাজার ৮৮০ জন নতুন শিক্ষকের জন্য ৫৬ দিনের আবাসিক বেসিক ট্রেনিং এবং ৫৩ হাজার ৭৬০ জন শিক্ষকের জন্য ৪২ দিনের আবাসিক প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ চলছে। এছাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ২৪ হাজার ৪০০ জন প্রধান শিক্ষকের জন্য ২১ দিনের লিডারশিপ ট্রেনিং, ১১ হাজার শিক্ষকের জন্য জলবায়ু ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, কাউন্সেলিং ও বুলিং প্রতিরোধে ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৪০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। আইসিটি বিষয়েও ২৯ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

লেইস প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার ৩৪০টি প্রতিষ্ঠানে ২০ হাজার ৬৮০টি স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে।

প্রকল্প পরিচালক প্রফেসর মো. আসাদুজ্জামান জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের (আইইআর) নেতৃত্বে এনসিটিবি, নায়েম ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষকদের টিচিং কম্পিটেন্সি ১৫ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যেও গবেষণাভিত্তিক ‘আর্লি ইমপ্যাক্ট স্টাডি’ পরিচালনা করা হচ্ছে।

এদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৩ জন শিক্ষকের পেশাগত মানোন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রস্তাবিত ‘নেক্সটজেন মাধ্যমিক শিক্ষা প্রকল্প’ ২০২৭-২০৩১ পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে প্রকল্পটির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তরে বড় বিনিয়োগ

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৭ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ৭ লাখের বেশি শিক্ষককে আধুনিক ট্যাবলেট-কম্পিউটার দেওয়া, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অন্তত ১০টি স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন, শ্রেণিকক্ষে ইন্টার‌্যাক্টিভ এডুকেশন প্যানেল স্থাপন, ১০০ এমবিপিএস ব্রডব্যান্ড সংযোগ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য একক ‘এডু আইডি’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

আঞ্চলিক পর্যায়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণের অবকাঠামো শক্তিশালী করতে দেশের ৩২টি বৃহৎ জেলায় প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘হায়ার সেকেন্ডারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’ (এইচএসটিটিআই) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া প্রস্তাবিত উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষকদের উন্নয়ন প্রকল্পের (এইচএসটিপিডিপি) আওতায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ লাখ শিক্ষকের জন্য ৩৫ দিনের মিশ্র পদ্ধতির বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ১০ হাজার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের জন্য ২৩ দিনের নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ এবং ৪ হাজার গভর্নিং বডি সদস্যের জন্য ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ

উচ্চশিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে শিক্ষকদের বিদেশে প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি আইইএলটিএস সহায়তা, বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের মানোন্নয়নে ৩৫০ কোটি টাকার প্রকল্প এবং ২২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘শিক্ষাবিদ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এছাড়া প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জাতীয় শিক্ষা টিভি চ্যানেল’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চ্যানেলটির মাধ্যমে এআই ও ইন্টার‌্যাক্টিভ শিক্ষামূলক কনটেন্ট সম্প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে।

মাউশির পরিচালক প্রফেসর নাজনীন বলেন, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ‘নেক্সটজেন’ প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে, লেইস প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ৩ লাখের বেশি শিক্ষকের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

সরকারি কলেজের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শিক্ষকের প্যাডাগজি প্রশিক্ষণের জন্য ‘ইপিডিসিটি স্কিম’ এবং গবেষণা ও ইনোভেশন মঞ্জুরির পরিকল্পনাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায়ও উদ্যোগ

কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষক দক্ষতা বাড়াতে গাজীপুরে প্রায় ৯৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বাংলাদেশ টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং কলেজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২ হাজার ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘টিভিইটি টিচার্স ফর দ্য ফিউচার’ (টিটিএফ) প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত ‘ব্রিজ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৭ হাজার শিক্ষককে ট্যাব দেওয়া এবং ৬ হাজার ৬০০টি ক্লাসরুম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৩ হাজার ২৩২ কোটি টাকার ‘স্কিলস’ প্রকল্পের মাধ্যমে ৫ হাজার শিক্ষককে দুই মাসের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষায় সারাদেশে সাতটি আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপনের পাশাপাশি ‘মাদ্রাসা এডুকেশন এক্সিলেন্স সাপোর্ট প্রোগ্রাম’ (মেসপ) এর মাধ্যমে নবনিযুক্ত শিক্ষকদের ৪৫ দিনের মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’

প্রাথমিক শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-৫) আওতায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ মডিউলের খসড়া এবং ১০০টি আইপিইএমআইএস ডিজিটাল মডেল কনটেন্ট প্রস্তুত করা হয়েছে।

দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়ার জন্য বাজেট প্রস্তুতের কাজও চলছে।

এছাড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ‘শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন এবং ৩৬ হাজার ৯৬০টি প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পদোন্নতি শেষ হলে শূন্য হওয়া সহকারী শিক্ষকের প্রায় ৪০ হাজার পদে ২০২৭ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের পেনশন ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন এবং রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ও সম্মান বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।