মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে মেট্রোরেলের মানবিকতায় মুগ্ধ: অপরিচিত মানুষের ভালোবাসায় ঋণী হয়ে রইলাম

মেট্রোরেলের ফার্মগেট স্টেশন। মাঝদুপুর। ভীষণ তাড়া ছিল। জরুরি কাজে যেতে হবে প্রেসক্লাবে। সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন বাংলাদেশের একজন বর্ষীয়ান সংস্কৃতিজন। সময়মতো পৌঁছানোর তাগিদে দ্রুত স্টেশনে প্রবেশ করলাম।

লিফটে উঠে নিরাপত্তাবেষ্টনী পেরিয়ে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছালাম। ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ শরীরটা কেমন অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করল। চারপাশ ঘোলাটে লাগছিল। প্রথমে ভাবলাম, চশমার কাচে হয়তো ধুলো জমেছে। চশমা খুলে মুছলাম। কিন্তু দৃষ্টির কোনো পরিবর্তন হলো না। মাথা ঝিমঝিম করছে, চোখের সামনে সবকিছু ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছে।

উত্তরাগামী ট্রেন এল। যাত্রীরা উঠলেন, নামলেন। ট্রেনটি চলেও গেল। কিন্তু আমার চারপাশের পৃথিবীটা যেন আরও বেশি অন্ধকার হয়ে আসছিল।

এরপর মতিঝিলগামী ট্রেন আসছে। মনে হচ্ছিল, পুরো স্টেশনটাই দুলছে। নাকি আমিই দুলছি, বুঝতে পারছিলাম না। ট্রেনটিকেও আর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না। ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ একজন আমাকে শক্ত করে জাপটে ধরলেন। এরপর কী ঘটেছে, তার কিছুই মনে নেই।

জ্ঞান ফিরে এলে দেখি, কয়েকজন মানুষ আমাকে ঘিরে রেখেছেন। কেউ পা ঘষে দিচ্ছেন, কেউ মাথায় পানি ঢালছেন, কেউ বাতাস করছেন। একজন আশ্বস্ত করে বলছেন, ‘আপনার সঙ্গে কেউ না থাকলেও চিন্তা করবেন না। আমরা আপনাকে পৌঁছে দেব।’

আমাকে আগলে রেখেছেন মেট্রোরেলের নিরাপত্তাকর্মীরা। আমার মোবাইল ফোন, ব্যাগ, এমনকি ক্যাটস চশমাটিও তাঁদের হেফাজতে নিরাপদে ছিল। তাঁদের দুজন সহকর্মী আমাকে চিকিৎসার জন্য পরিচর্যাকক্ষে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

এরই মধ্যে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন সহযাত্রী নিজের সময় ও অর্থ ব্যয় করে আমার জন্য খাবার কিনতে বেরিয়ে গেলেন। ‘ঘরের বাজারে’ চকলেট না পেয়ে কিনে আনলেন মধু। এরপর আপন ভাইয়ের মতো স্নেহভরে আমার মুখে তুলে দিলেন। কেউ টিস্যু এগিয়ে দিচ্ছেন, কেউ খাবার পানি দিচ্ছেন।

অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ সত্যিই আমাকে আবেগাপ্লুত করেছে। জীবনের কঠিন এক মুহূর্তে মানুষের প্রতি মানুষের এই মমতা যে কত বড় আশ্রয় হতে পারে, সেদিন তা নিজের চোখে দেখেছি।

মেট্রোরেলের নিরাপত্তাকর্মীদের আন্তরিক সেবা ও মানবিক আচরণের জন্য তাঁদের প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা। তাঁরা শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালন করেননি, বরং বিপদের মুহূর্তে আপনজনের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের এই আন্তরিকতা ও মমতার কাছে আমি চিরঋণী হয়ে রইলাম।

পরে সেই দুই নিরাপত্তাকর্মী আমাকে মেট্রোরেলে তুলে দিলেন। বসার ব্যবস্থা করে নিশ্চিত হলেন, আমি ঠিক আছি। সবকিছু বুঝে নিয়েই তাঁরা বিদায় জানালেন।

তবে মনের মধ্যে একটি ছোট্ট আফসোস রয়ে গেছে। এত কিছুর মধ্যে তাঁদের নাম জিজ্ঞেস করার কথা মনেই আসেনি। অথচ নাম দুটি জেনে রাখা উচিত ছিল। অন্তত আজ কৃতজ্ঞতাটুকু তাঁদের নাম ধরে প্রকাশ করতে পারতাম।

সেদিন উপলব্ধি করেছি, বিপদের সময় মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কখনো কখনো সম্পূর্ণ অপরিচিত কিছু মানুষ এমনভাবে পাশে দাঁড়ান, যেন তাঁরা বহুদিনের আপনজন। তাঁদের মানবিকতা নতুন করে মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়।

সেই অচেনা সহযাত্রী, মেট্রোরেলের দুই মানবিক নিরাপত্তাকর্মী এবং সেদিন যাঁরা আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সবার প্রতি রইল গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।

আলহামদুলিল্লাহ, এখন ভালো আছি।

মানুষের কাছে এমন ঋণ থাকুক। যে ঋণ শোধ করার নয়, হৃদয়ের গভীরে আজীবন আগলে রাখার।