৮৩০ পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনের পথে প্রথম জাহাজ

দীর্ঘ অপেক্ষা ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে চলতি মৌসুমে কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল পৌনে ৮টার দিকে ৮৩০ জন পর্যটক নিয়ে দ্বীপটির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এমভি বার আউলিয়া।

সকালে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাটে পর্যটকদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আসা পর্যটকদের অপেক্ষার অবসান ঘটে জাহাজটি ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।

এর আগে গত ১ নভেম্বর পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন উন্মুক্ত ঘোষণা করা হলেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতায় জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়নি। এতে আগাম টিকিট কেনা পর্যটক ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।

বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যা পর্যন্ত জাহাজ চলাচল নিয়ে সংশয় ছিল। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদন পাওয়া গেলেও জেলা প্রশাসকের সম্মতি না মেলায় বৃহস্পতিবার থেকে যাত্রা শুরু হবে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না।

পরে বুধবার রাত ১১টার দিকে জেলা প্রশাসকের সম্মতি পাওয়ার পর জাহাজ চলাচলের সিদ্ধান্তের কথা জানান সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্রথম দিনে একটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়।

চলবে তিনটি জাহাজ

প্রথম দিন এমভি বার আউলিয়া ৮৩০ জন পর্যটক নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পর্যায়ক্রমে এমভি কর্ণফুলি ও এমভি টেকনাফ চলাচল করবে।

তিনটি জাহাজের মোট যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়ার ধারণক্ষমতা ৮৫০, এমভি কর্ণফুলির ৭৩২ এবং এমভি টেকনাফের ৭১৬ জন।

নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, এমভি বার আউলিয়া সকাল ৭টায় কক্সবাজার থেকে ছেড়ে দ্বীপ থেকে ফিরবে বেলা আড়াইটায়। এমভি কর্ণফুলি সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে যাত্রা করে ফিরবে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে। আর এমভি টেকনাফ সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যাত্রা শুরু করে ফিরবে বিকেল সাড়ে ৩টায়।

পর্যটকদের জন্য থাকছে বিধিনিষেধ

সরকারের সংশোধিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্টমার্টিন ভ্রমণ ও সেখানে রাত্রিযাপন করতে পারবেন। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।

দ্বীপ ভ্রমণে প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এ ছাড়া দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। রাতে সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন নিষিদ্ধ। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচাও করা যাবে না।

সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ কোনো সামুদ্রিক প্রাণী বা উদ্ভিদের ক্ষতি করা যাবে না। এ ছাড়া সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো ধরনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।

পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি

জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার কারণে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসহ পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা ক্ষতির আশঙ্কায় ছিলেন।

জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে দ্বীপে পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যটন মৌসুমে দ্বীপের অনেক বাসিন্দার জীবিকা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।

তবে পর্যটন কার্যক্রম বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। অপরিকল্পিত পর্যটন, প্লাস্টিক বর্জ্য, অতিরিক্ত শব্দ ও মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরেই দ্বীপটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পর্যটকদের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি সরকারি বিধিনিষেধ কার্যকর করা হবে। এতে পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।

শিরোনামটি আরও সংক্ষিপ্ত করুনখবরটি আরও নিউজ-স্টাইলে সাজান