২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নিজের বিরুদ্ধে চলমান মামলার পুনঃতদন্ত চেয়ে আবেদন করেন সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। তিনি সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও তার টিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে এ আবেদন করেন।

তবে ইনুর এই আবেদনে সাড়া দেয়নি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষ এ ধরনের আবেদনের বিরোধিতা করে। শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এর বিচারিক প্যানেল ইনুর আবেদন খারিজ করে দেন।

পরে মামলায় ইনুর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন সিনিয়র আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। শুনানি অসমাপ্ত থাকায় মামলার কার্যক্রম সোমবার (৬ এপ্রিল) পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। এদিন দুপুরে বিষয়টি নিয়ে আরও শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ বলেন, জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলোর তদন্ত ও সাক্ষ্য সংগ্রহে সদ্য সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও তার টিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ পাওয়ায় পুনঃতদন্ত চাওয়া হয়েছিল। ন্যায়বিচারের স্বার্থে আরও কয়েকটি কারণ দেখিয়েও এই আবেদন করা হয়, তবে আদালত তা খারিজ করে দেন।

আসামিপক্ষের দাবি, মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ইনুকে চাপ ও হুমকি দিয়েছেন এবং ট্রাইব্যুনালে বক্তব্য উপস্থাপনে বাধা দিয়েছেন, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। গত বছরের ২০ জুলাই ইনু অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আদালতের অনুমতি ছাড়াই কারাগারে গিয়ে তার কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ করেন। তখনও তাজুল ইসলাম তার বক্তব্য উপস্থাপনের বিরোধিতা করেন বলে দাবি করা হয়।

আইনজীবী সিফাত মাহমুদ আরও বলেন, অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদনের শুনানিতে আসামিপক্ষের বক্তব্যকে তাজুল ইসলাম রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে উল্লেখ করেন, যা আসামিপক্ষের স্বাধীনভাবে মামলা পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করেছে। তিনি ট্রাইব্যুনালের বাইরেও মিডিয়ার সামনে এ ধরনের মন্তব্য করেছেন বলেও অভিযোগ তোলা হয়।

আসামিপক্ষের মতে, ইনুর মামলায় তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটরের স্বার্থের সংঘাত ছিল। কারণ তাজুল ইসলাম জুলাই–আগস্ট আন্দোলনে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছিলেন এবং আন্দোলনকারীদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন—এমন দাবি করা হয়। এছাড়া রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণেও তিনি নিরপেক্ষ ছিলেন না বলে অভিযোগ করা হয়।

তবে পুনঃতদন্তের আবেদন প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আসামিপক্ষ থেকে পুনঃতদন্ত চাওয়ার কোনো বিধান ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় নেই। আদালতের ইনহ্যারেন্ট ক্ষমতার কথা বলে আবেদন করা হলেও তা প্রযোজ্য নয় বলে রাষ্ট্রপক্ষের মত। বিচার বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যেই এ আবেদন করা হয়েছে বলে আদালত তা খারিজ করেছেন।

উল্লেখ্য, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সরকার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলামকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করা হয়। পরে তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন আরেক প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ।

এদিকে সুলতান মাহমুদকে অপসারণের জন্য আগেই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টার কাছে অনুরোধ করেছিলেন তাজুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে তথ্য পাচার, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও নিরাপত্তা প্রহরীকে মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

এ ঘটনার মধ্যেই বিচারাধীন মামলার আসামিকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে এক প্রসিকিউটরের ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। বিষয়টি তদন্তে ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রসিকিউশনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ বিচারকাজে প্রভাব ফেলবে না।