একদিকে ট্রাফিক সিগন্যালের লাল বাতি, অন্যদিকে পুলিশের হাতের ইশারা—মুহূর্তেই থেমে যায় শত শত যানবাহন। আবার সবুজ সংকেত কিংবা পুলিশের নির্দেশে শুরু হয় চলাচল। কিন্তু হঠাৎ যদি সড়কে এই নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তাহলে ঢাকার রাস্তায় কী পরিস্থিতি তৈরি হবে?
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে প্রতিদিন লাখো মানুষের চলাচল। কয়েক সেকেন্ডের ভুল সিদ্ধান্তই তৈরি করতে পারে দীর্ঘ যানজট। কোথাও লেন পরিবর্তন, কোথাও যত্রতত্র গাড়ি থামানো—এমন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। তাদের অনুপস্থিতিতে একদিকে সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়তে পারে, অন্যদিকে বাড়তে পারে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।
মোটরসাইকেল চালক রাজু বলেন, “ভাই, আমরা বাঙালি সবসময় আগে যেতে চাই। আইন মানি না। ট্রাফিক পুলিশ থাকার কারণে রাস্তায় শৃঙ্খলা ঠিক আছে। তারা যদি না থাকে তাহলে প্রতিদিন দুর্ঘটনা বাড়বে।”
রাজুর মতো কয়েকজন পথচারীর বক্তব্যও একই। তাদের ভাষ্য, সড়কে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একজন পথচারী বলেন, “কথায় আছে, রাগী মানুষের সংসার ভালো। যদি শাসনই না থাকে, তাহলে নিয়ন্ত্রণ থাকবে কীভাবে? ট্রাফিক পুলিশের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।”
শুধু যানবাহন নিয়ন্ত্রণ নয়, পথচারীদের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে যেসব মোড়ে সিগন্যাল থাকলেও চালক ও পথচারীদের অসচেতনতায় তৈরি হয় অনিশ্চয়তা, সেখানে পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা।
রাজধানীর দুই কোটিরও বেশি মানুষের চলাচল ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ১০০ ট্রাফিক পুলিশ সদস্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, রাজধানীর বিশাল জনসংখ্যা ও যানবাহনের তুলনায় এই সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ রাজধানীকে আটটি ট্রাফিক অঞ্চলে ভাগ করে আইন প্রয়োগ, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। তবে সীমিতসংখ্যক ট্রাফিক পুলিশের ওপর নির্ভর করে রাজধানীর সড়কে দীর্ঘমেয়াদে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা কঠিন। এ জন্য ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি চালক ও পথচারীদের সচেতনতাও জরুরি।
নিজেদের সচেতন হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে পথচারী আব্বাস বলেন, “ট্রাফিক পুলিশ আছে, ফুটওভার ব্রিজও আছে। তারপরও আমরা গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পারাপার করি। এটা ঠিক না। আগে নিজের জীবন রক্ষায় সচেতন হতে হবে। আইন মানতে হবে, ট্রাফিক সিগন্যাল মানতে হবে। তাহলেই রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরবে এবং দুর্ঘটনা থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে।”
ঢাকার সড়কে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব শুধু গাড়ি থামানো কিংবা যানজট নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়। পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারে সহায়তা করা এবং দুর্ঘটনা বা আকস্মিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়াও তাদের দায়িত্বের অংশ।
ভবিষ্যতে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়লে সড়ক নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি চালকদের আইন মেনে চলা, পথচারীদের সচেতনতা এবং কার্যকর সড়ক ব্যবস্থাপনা ছাড়া শৃঙ্খলিত নগর পরিবহন নিশ্চিত করা কঠিন বলে মনে করছেন ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তারা।
ট্রাফিক বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক সর্দার মোহাম্মদ তারিকুল বলেন, “মানুষ এখনও শতভাগ সচেতন নয়। ফলে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালনে কষ্ট হলেও আমরা অনবরত কাজ করে চলছি। ঢাকায় দুই কোটির বেশি মানুষের বসবাস। সেখানে ৩ থেকে ৪ হাজার ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। তবুও আমরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। সবচেয়ে বেশি জরুরি সবার সচেতনতা। চালক ও পথচারী উভয়েই যখন আইন ও সিগন্যাল মেনে চলবেন, তখনই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।”
তাহলে ট্রাফিক পুলিশ না থাকলে ঢাকার সড়কে কী হতে পারে? উত্তর শুধু যানজট বা বিশৃঙ্খলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন দায়িত্বশীল চালক, সচেতন পথচারী এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। কারণ, সীমিতসংখ্যক ট্রাফিক পুলিশের ওপর নির্ভর করে একা ঢাকার মতো বিশাল নগরীর সড়কে দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
মন্তব্য (0)
প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।