
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক সমন্বয়কারীদের সংগঠন এবং সেই আন্দোলনে যুক্ত ছাত্রশিবির নেতা সাদিক কায়েমের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এই অভিযোগের পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।
তিনি নাহিদ ইসলামের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম অগ্রসেনানী সাদিক কায়েমের বিরুদ্ধে কখনোই কোনো অসততার অভিযোগ ওঠেনি।
৩১ জুলাই বৃহস্পতিবার, বেলা ২টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি পোস্টে জুলকারনাইন সায়ের এ মন্তব্য করেন।
তিনি লেখেন, “জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির কর্মী এবং ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে আজ পর্যন্ত যিনি কোনো ধরনের অসততার অভিযোগের মুখোমুখি হননি, তার নাম আবু সাদিক (Md Abu Shadik)।”
জুলকারনাইন তার পোস্টে প্রশ্ন রাখেন, “স্বাভাবিকভাবেই তাকে ও তার ঘনিষ্ঠদের নিয়ে নানা ধরনের মুখরোচক আলোচনা তৈরি হবে। কিন্তু এসব কথাবার্তা দিয়ে কি নিজেদের গোপন সত্য ঢেকে রাখা যাবে?”
এর আগে, একই দিন দুপুরে নাহিদ ইসলাম নিজের ফেসবুকে এক পোস্টে শিবির, সাদিক কায়েম এবং ‘ক্যু পরিকল্পনা’সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেন। তার এই পোস্ট দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তোলে।
তিনি দাবি করেন, এক টকশোতে সাদিক কায়েম মিথ্যা বলেছেন। নাহিদের ভাষায়, “তিনি বলেছেন ছাত্রশক্তির গঠনপ্রক্রিয়ায় শিবির ছিল, আর আমরা শিবিরের নির্দেশেই কাজ করতাম—এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
নাহিদ আরও লেখেন, “‘গুরুবার আড্ডা’ পাঠচক্রের কিছু সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অধিকার আন্দোলন থেকে পদত্যাগ করা একটি অংশ, এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্টাডি সার্কেল মিলে ‘ছাত্রশক্তি’র জন্ম হয়।”

একটি নতুন ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে ‘গুরুবার আড্ডা’ পাঠচক্রে কাজ করেছি—এ তথ্য জানিয়ে নাহিদ আরও বলেন, “আমরা আট বছর ধরে ক্যাম্পাসে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ফলে প্রকাশ্য ও গোপন—সব ধরনের সংগঠন ও নেতৃত্ব সম্পর্কে আমাদের পরিচিতি ছিল, এবং সব পক্ষের সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ ছিল। এই যোগাযোগ বা সম্পর্ক থাকা, বা কোনো সময় সহযোগিতা করা মানেই এই নয় যে তারা আমাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল।”
নাহিদ আরও জানান, সাদিক কায়েম কখনোই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো আনুষ্ঠানিক সমন্বয়ক ছিলেন না। ৫ আগস্টের ঘটনার পর থেকে তিনি নিজ উদ্যোগে এই পরিচয় ব্যবহার করতে শুরু করেন। অভ্যুত্থানে শিবিরের সক্রিয় ভূমিকার কারণেই প্রেস ব্রিফিংয়ে তাকে বসানো হয়। তবে পরবর্তীতে সাদিক কায়েমরা প্রচার শুরু করে যে পুরো অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাবি শিবির, আর অন্যরা ছিল শুধু সামনের সারির পোস্টারধারী। নাহিদ বলেন, “শিবিরের অংশগ্রহণ অস্বীকার করা হয়নি, তবে এটি তাদের একক উদ্যোগে সংগঠিত হয়নি, কিংবা শিবিরের কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনাতেও হয়নি। আমরা সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
কে বা কারা ক্ষমতার অংশীদার হতে চাইছে কিংবা গোষ্ঠীগত স্বার্থ রক্ষায় তৎপর—এই বিষয়ে পরে বিস্তারিত বলবেন বলে জানান এনসিপির এই নেতা।
গত বছরের ২ আগস্ট রাতে একটি সামরিক ক্যুয়ের চেষ্টার প্রসঙ্গ তুলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “জুলকারনাইন সায়েরসহ একটি পক্ষ সামরিক বাহিনীর একটি অংশের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা করেছিল। সেই উদ্দেশ্যে কথিত ‘সেইফ হাউজে’ থাকা ছাত্রনেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়—তাদের হুমকি দেওয়া হয় যেন তারা ওই রাতেই ফেসবুকে সরকারের পতনের একদফা ঘোষণা দেয় এবং আমাদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ ছিন্ন করে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের অবস্থান ছিল, একদফার দাবি আসতে হবে মাঠ থেকে, জনগণের ভেতর থেকে। কেউ যদি গোপনে চাপ প্রয়োগ করে, তাহলে তাদের উদ্দেশ্য অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা প্রথম থেকেই পরিষ্কার ছিলাম—কোনোভাবেই সেনাবাহিনী বা তাদের সহযোগী গোষ্ঠীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যাবে না। এতে আবার একটি ‘এক-এগারো’ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যার সুযোগে আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে এবং সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা চেয়েছিলাম এটি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে পরবর্তী ধাপ এগিয়ে যাক।”
এসব বিষয় নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে জুলকারনাইন সায়ের, নাহিদ ইসলাম ও তার বাবার সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া চাঁদাবাজ রিয়াদের ছবি যুক্ত করে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন।

ওই পোস্টে তিনি লেখেন:
“কিছু প্রশ্নঃ
১. বিপ্লব শুরুর আগে ‘ছাত্রশক্তি’র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন কর্মী ছিল?
২. দেশের আর কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সংগঠন বা কমিটি ছিল?
৩. ৫ আগস্টের আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব সমন্বয়ক ছিলেন, নাহিদ ইসলাম কি তাদের চেনার কথা বলেন?
৪. শুধুমাত্র ‘ছাত্রশক্তি’র পক্ষে কি আদৌ এমন একটি বিপ্লব সংগঠিত করার মতো সাংগঠনিক কাঠামো বা প্রস্তুতি ছিল?
৫. গুটিকয়েক সাংবাদিক বা মানবাধিকারকর্মী কিছু না বললে, নাহিদ ইসলামরা কি সাদেক কায়েমের অবদানের কথা জাতিকে জানাতেন?”
পুনশ্চঃ
নাহিদ ইসলাম, আপনাকে স্পষ্ট করে জানাচ্ছি—আমি বৈষম্যবিরোধী চাঁদাবাজ রিয়াদকে কখনও কোনো ধরনের নজরদারিতে রাখিনি। আর সে যে সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে, সেই ক্যামেরা লাগানোর সঙ্গেও আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

আমি আগে থেকেই জানতাম, রিয়াদ আপনার শেল্টারে ছিল। পরে আরও জানতে পারি, রিয়াদের সঙ্গে আপনার এবং আপনার বাবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আপনি যেভাবে আমার উপর রাগান্বিত হয়েছেন, সেটা হয়েছে মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে। আপনাকে বলা হয়েছে—রিয়াদকে গ্রেপ্তারে নাকি আমার বড় ভূমিকা ছিল।
আমি দৃঢ়ভাবে আপনাকে জানাতে চাই, চাঁদাবাজির অভিযোগে রিয়াদ গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় আমার কোনো হাত নেই।
মন্তব্য (0)
প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।