কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর ফের আলোচনায় এসেছে স্থানীয় কিশোর গ্যাংগুলোর তৎপরতা। অভিযোগ রয়েছে, এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। একা পেলে পথচারী ও শিক্ষার্থীদের আটকে মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অনেকে আবার টিকটক ভিডিও তৈরি করে ঘুরে বেড়ায়। কোটবাড়ি সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় মাদক কেনাবেচা ও সেবনের সঙ্গেও তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসান (১৫) ‘কেবিজি’ নামের একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। কেবিজির পূর্ণ নাম ‘কোটবাড়ি বাইকার গ্রুপ’।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিন। সেও কেবিজির সদস্য। গ্রেপ্তার হওয়া মোহাম্মদ সিয়ামের (১৫) সঙ্গে তুহিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। স্থানীয়দের কাছে তুহিন একজন ‘উচ্ছৃঙ্খল’ তরুণ হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানা ও আশপাশের এলাকায় কেএনএফ, ইসমাইল, ‘র’ ও সিবিকেসহ কয়েকটি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। গত প্রায় ছয় বছরে আরও বেশ কিছু গ্রুপ সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে মডার্ন, রকস্টার, রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, ইগল, আরজিএস, র্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিএমসি ও ডিস্কো বয়েজ উল্লেখযোগ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সদর দক্ষিণে সক্রিয় কেবিজির নেতৃত্বে রয়েছেন আলী সাইমন। তার দলে সোহাগ রানা ও মোহাম্মদ হানজালাসহ আরও কয়েকজন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাইমনের এক মামা আড়াল থেকে এই গ্রুপকে সহযোগিতা করেন। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত ২৮ আগস্ট আমির হোসেনের খামারে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি দল গিয়ে ফটক ভাঙচুরের চেষ্টা করে। চাঁদা না দিলে খামারে আগুন দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। ১৫ থেকে ২০টি মোটরসাইকেল ও দুটি মাইক্রোবাসে করে দলটি সেখানে যায়। পরে এলাকাবাসী জড়ো হলে তারা পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশও ঘটনাস্থলে যায়।
জানা গেছে, খামারের পাশে এক ব্যক্তির জমি রয়েছে। তার পক্ষ নিয়ে ওই দলটি ভাঙচুরের চেষ্টা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় আমির হোসেন সদর দক্ষিণ থানায় অভিযোগ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কুমিল্লার কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্য অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তারা গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে অবস্থান করে, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালায় এবং বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘কেবিজি, কেএনএফসহ যেসব গ্রুপের তথ্য পুলিশের কাছে আসছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি জানান, বুধবার রাতে কিশোর গ্যাংয়ের ৫৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩২ জনকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দুজনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। বাকিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা ২ হাজার ৫৫০। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, সিলেটে ১৫টি, রাজশাহী ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি করে এবং খুলনা মহানগরে ৭টি গ্রুপ রয়েছে। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি ২৫টি গ্যাং রয়েছে নোয়াখালীতে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ১৫৯টি এবং এসব গ্রুপের সদস্য ১ হাজার ৮১২ জন। ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৭টি গ্যাং রয়েছে মোহাম্মদপুরে; সেখানে সদস্যসংখ্যা অন্তত সাড়ে ৩০০। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬টি গ্যাং রয়েছে পল্লবী থানা এলাকায়, যেখানে সদস্যসংখ্যা অন্তত ১৬০।
মন্তব্য (0)
প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।