স্কুলের মাঠে রাইড ও স্টল, ছাদে মাইকের হর্ন। পাশে বসানো হয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর। মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে চলছে উচ্চ শব্দের সাউন্ড সিস্টেম। এতে চৌগাছার ঐতিহ্যবাহী বলুহ মেলা শুরুর প্রথম দিনেই ব্যাহত হচ্ছে হাজরাখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাজরাখানা পীর বলুহ দেওয়ান দাখিল মাদ্রাসার স্বাভাবিক পাঠদান। প্রশাসনের দেওয়া একাধিক শর্ত উপেক্ষা করে এসব আয়োজন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে মেলা আয়োজক কমিটির বিরুদ্ধে।

মেলার অনুমতিপত্রে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কোনো স্টল না বসানো, উচ্চ শব্দে সাউন্ড সিস্টেম না বাজানো এবং রাত ৮টার পর মেলা বন্ধ রাখাসহ মোট ১৯টি শর্ত দেওয়া হয়েছে। তবে মেলা শুরুর দিন সরেজমিনে গিয়ে এসব শর্তের বেশ কয়েকটি বাস্তবায়ন না হওয়ার চিত্র দেখা গেছে।

যশোর জেলা প্রশাসন ১৫ দিনের জন্য বলুহ মেলার অনুমতি দিয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া মেলা চলার কথা রয়েছে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অনুমতিপত্রের শর্ত অনুযায়ী, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কোনো স্টল বসানো যাবে না। একই সঙ্গে জুয়া, সার্কাস, লাকি কুপন, পুতুল নাচ, চরকি ও র‌্যাফেল ড্রসহ জুয়া ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাজার এলাকায় মাদক বিক্রি ও সেবন বন্ধ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ না নেওয়ার শর্তও রয়েছে।

তবে সরেজমিনে দেখা যায়, হাজরাখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় কয়েকটি রাইড ও স্টল বসানো হয়েছে। বিদ্যালয়ের ছাদে স্থাপন করা হয়েছে মাইকের হর্ন। বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষের পাশেই বসানো হয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর। মেলা প্রাঙ্গণ থেকে উচ্চ শব্দে সাউন্ড সিস্টেমও বাজানো হচ্ছে। এ ছাড়া লাকি কুপন, লটারি, জুয়া ও সার্কাস চলার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রতিবছর মেলার কারণে এই দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। মেলার শব্দ, ভিড় ও যানবাহনের কারণে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এবারও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘মেলা হোক, এতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু স্কুলের কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়। বিদ্যুৎ থাকলে সাউন্ড বক্সের উচ্চ শব্দ, আর বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটরের শব্দে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারি না।’

হাজরাখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাসলিমা খাতুন বলেন, ‘আমাদের কিছু বলার নেই, মেলা চলবেই। প্রতিবছরই মেলার সময় শ্রেণিকার্যক্রম ব্যাহত হয়। জেনারেটরটি একেবারে অফিসের পাশে বসানো হয়েছে। বিদ্যুৎ থাকলে সাউন্ড বক্সের উচ্চ শব্দ আর না থাকলে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটরের শব্দে অফিসকক্ষে বসা যায় না।’

হাজরাখানা পীর বলুহ দেওয়ান দাখিল মাদ্রাসার সুপার সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর মেলার সময় শ্রেণিকার্যক্রম ব্যাহত হয়। মেলার ভিড়ের কারণে প্রতিষ্ঠানের যানবাহন চলাচল করতে পারে না। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমে যায়। মেলা শেষে শিক্ষার্থীদের আবার নিয়মিত শ্রেণিতে ফিরিয়ে আনতেও অনেক কষ্ট হয়।

চৌগাছা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সকালে স্কুলে গিয়ে তিনি দেখেন, বিভিন্ন গাড়ি পার্কিং করে স্কুল মাঠ ভরে গেছে। চলাচলের কোনো সুযোগ ছিল না। একই সঙ্গে স্কুলের জায়গায় কয়েকটি স্টল বসানো হয়েছিল। তিনি নিজে সেগুলো সরিয়ে দিয়েছেন। মেলা কর্তৃপক্ষকে কোনোভাবেই যেন স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে বলা হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মেলার সময়সীমা নিয়েও প্রতিবছর প্রশ্ন ওঠে। তাদের দাবি, আগে সাত দিনের অনুমতি নিয়ে ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত মেলা চলার নজির রয়েছে। এবার ১৫ দিনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পরও মেলা চলবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে তাদের। মেলার কারণে স্থানীয়দের স্বাভাবিক চলাচল ও জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

চৌগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মামুনুর রশিদ বলেন, মেলার শর্ত ভঙ্গ করার কোনো সুযোগ নেই। স্কুল মাঠে বসানো দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে। স্কুল আঙিনায় শব্দ বন্ধ করার জন্য নোটিশ করা হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনুমতিপত্রে উল্লেখিত যেকোনো শর্ত ভঙ্গ করা হলে পুলিশ কঠোর ভূমিকা রাখবে।