টাঙ্গাইলের বাসাইলে ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগের ঘটনায় সরেজমিনে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১টা পর্যন্ত দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের একটি দল সেতুটিতে অভিযান চালায়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন। এ সময় উপসহকারী পরিচালক বাসেদ আলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযান শেষে সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে সেতুটিতে অনিয়মের বিষয়টি মনে হয়েছে। দুদকের কর্মকর্তারা ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিংয়ের পিলার ভেঙে পরীক্ষা করে দেখতে পান, সেখানে প্রয়োজনের তুলনায় রডের পরিমাণ কম রয়েছে। এ বিষয়ে সরেজমিনে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষার পর বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে তা কমিশনে জানানো হবে। এরপর কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাঁশ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে ব্যবহৃত বাঁশ পাওয়া যায়নি। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে শাটারিংয়ের কাজে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টি দেখা গেছে।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাসাইল থানায় মামলা হওয়ার পর সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া সেতুর কাছ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলায় ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর আলম ও সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে আসামি করা হয়েছে।
একই ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন ও বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম এবং উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন।
জানা গেছে, বাসাইল উপজেলার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর বাসাইল জিসি-কাউলজানী ইউপি ভায়া মাইজখাড়া জিপিএস সড়কে ৯০ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামে দুটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুটির নির্মাণকাজ করছে।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরিতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করেন। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখতে পেয়ে বাধা দিলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তারা ওই কাজের ভিডিও ধারণ করেন। পরে স্থানীয়রা চলে গেলে আবারও রাতে ঢালাইয়ের কাজ শুরু করে তা শেষ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেতুটি পরিদর্শন ও তদন্তের উদ্যোগ নেয়।
এলজিইডির অফিস আদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ কারণে উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান জানান, তার অনুপস্থিতিতে ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর ও সাব-ঠিকাদার শাহ আলম কাউকে না জানিয়ে রাতে ওয়াকওয়ে ও ফুটপাতের ঢালাইয়ের কাজ করেন। বিষয়টি ত্রুটিপূর্ণ ও নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঢাকা অঞ্চল ও টাঙ্গাইল এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ল্যাব টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য (0)
প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।