ফাতেমা বলেন, নেপালের তরুণেরা যেভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে পেরেছে, তা দেখে বাংলাদেশের বাস্তবতা নিয়ে হতাশ হতে হয়। তাঁর মতে, একই ধরনের পরিবর্তন বাংলাদেশে সম্ভব হয়নি।
নেপালের তরুণ নেতারা তাদের সাফল্যের পেছনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আন্দোলনের সংযোগকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। আরএসপির প্রার্থী কেপি খানাল বলেন, জেন-জি আন্দোলন দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভকে সামনে এনেছে। তরুণদের আত্মত্যাগ মানুষের মনে প্রভাব ফেলেছে এবং ধারাবাহিকভাবে জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের কথা বলায় আন্দোলনটি বিশ্বাসযোগ্যতায় রূপ নেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের রাজনৈতিক বাস্তবতাও নতুন দলকে সুবিধা দিয়েছে। দেশটির নির্বাচনি ব্যবস্থায় জোট সরকারই বেশি দেখা যায় এবং দীর্ঘদিন ধরে কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। গত ১৭ বছরে ১৪টি সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর প্রতি জনগণের হতাশা বেড়ে যায় এবং নতুন শক্তি হিসেবে আরএসপি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
গবেষক নীতাশা কৌল বলেন, নেপালের তিনটি প্রধান দলই জনসমর্থন হারিয়েছিল, যার বড় সুবিধা পেয়েছে তরুণদের দল আরএসপি। বালেন্দ্র শাহের সঙ্গে জোট, সংগঠন শক্তি, অর্থ ও নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে দলটি নির্বাচনে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিশালী দলীয় কাঠামো ছাড়া নতুন দলের বড় সাফল্য পাওয়া কঠিন বলেও মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
নেপালের তরুণ কর্মী পুরুষোত্তম সুপ্রভাত যাদব বলেন, আন্দোলন গড়া আর নির্বাচন জেতা এক বিষয় নয়। তিনি নতুন দল গঠনের বদলে আরএসপিতে যোগ দেন এবং পরে সংসদ সদস্য হন। নীতাশা কৌলও বলেন, শুধু আবেগ বা ক্ষোভ দিয়ে আন্দোলন সম্ভব হলেও নির্বাচনে জিততে দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন জরুরি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই উপাদানগুলোর ঘাটতি ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিরোধী দলগুলো নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরে জনসমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়। ফলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো আন্দোলনের রাজনৈতিক সুফল বেশি পায়।
গবেষক ইমরান আহমেদ বলেন, প্রতিষ্ঠিত দলগুলো নিজেদের সংস্কারপন্থি হিসেবে তুলে ধরে আন্দোলনের শক্তিকে নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয়, যা নতুন তরুণ দলগুলোর পক্ষে সম্ভব হয়নি। এনসিপির জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করাও তাদের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। এতে তরুণ ও নারী ভোটারদের একটি অংশ দূরে সরে যায়।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক ঋষি গুপ্ত বলেন, পশ্চাৎপদ শক্তির সঙ্গে জোট করে এনসিপি জেন-জি প্রজন্মের স্বার্থের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ে এবং বৃহত্তর ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ হারায়।
সময়ের ব্যবধানও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশে আন্দোলন ও নির্বাচনের মধ্যে প্রায় দেড় বছরের ব্যবধান থাকায় আন্দোলনের গতি কমে যায়। অন্যদিকে নেপালে অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন হওয়ায় সেই গতি ধরে রাখা সম্ভব হয়।
তবে বাংলাদেশের তরুণদের আন্দোলন কিছু পরিবর্তন আনতে পেরেছে। জাতীয় রাজনীতিতে সংস্কারের আলোচনা সামনে এসেছে এবং গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়েছে। নতুন সরকার ৩১ দফা সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও অনেকে এটিকে প্রচলিত ধারার পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন।
বর্তমানে অনেক তরুণ রাজনীতি নিয়ে হতাশ হয়ে বিদেশমুখী হচ্ছেন। উমামা ফাতেমা বলেন, আগে যারা দেশে থেকে পরিবর্তন আনতে চাইতেন, তাদের অনেকেই এখন বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
তবু আশার কথাও আছে। কেউ কেউ মনে করেন, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি সংগঠন শক্তিশালী করতে পারলে ভবিষ্যতে ভালো করতে পারে। নেপাল ও বাংলাদেশের তরুণদের লক্ষ্য একই—পরিবর্তন আনা। নেপালের তরুণেরা এখন সংসদে থেকে সেই লক্ষ্য ধরে রাখতে চান, আর বাংলাদেশের তরুণেরা প্রয়োজনে আবারও রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।