জাতীয় সংসদ ভবন

গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে এগোনোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই গণভোটে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ৬২ শতাংশের বেশি ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পথ খোলা হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্বও পালন করবেন। সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে তারা সনদে বর্ণিত সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করবেন।

সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের আলোকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পর গণভোটে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪৭টি ছিল সাংবিধানিক। বেশ কিছু প্রস্তাবে বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি থাকায় সব প্রস্তাব কার্যকর হবে না। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করায় নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে বিশেষ কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে না।

তবে দুইকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষের গঠন নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিএনপি তাদের ইশতেহারে সংসদের আসন অনুযায়ী উচ্চকক্ষ গঠনের কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে গণভোটে সরাসরি অনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রশ্ন ছিল। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বিএনপি যে ইশতেহার দিয়েছে তা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে জনগণের কাছে উপস্থাপিত হয়নি, কিন্তু সংসদের উচ্চকক্ষ অনুপাতিক ভোটের মাধ্যমে তৈরি করার বিষয়ে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়েছে’।

গণভোটে হ্যাঁ জয়লাভের পরও কিছু সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকায় সেগুলো বাস্তবায়িত হবে না বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন, আর ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন ‘না’ ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রদত্ত ভোটের ৬০ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ হওয়ার কারণে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যেসব বাধা ছিল, তা দূর হয়েছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর হলো আইনি ভিত্তি হিসেবে আদেশ জারি করা। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন। দ্বিতীয় স্তর হলো গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন নেওয়া। সনদ স্বাক্ষরের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা বিরোধ সৃষ্টি হয়, যা রাজপথ পর্যন্ত গড়ে ওঠে। সেই বিরোধ মেটাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের সিদ্ধান্ত নেন। ১২ই ফেব্রুয়ারির গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় এখন সনদ বাস্তবায়নের তৃতীয় স্তর শুরু হচ্ছে।

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণের পর সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করবেন। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে এই পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের মেয়াদ হবে ১৮০ কার্যদিবস। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, সংসদ সদস্যরা দুটি শপথ গ্রহণ করবেন—একটি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।