টেন্ডার ও প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ, ইউএনওর নির্দেশে বন্ধ কাজ

নওগাঁর মহাদেবপুরে টেন্ডার ও প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করার অভিযোগ উঠেছে উত্তরগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হাছানের বিরুদ্ধে। পরিষদ চত্বরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নিজের উদ্যোগে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন তিনি। তবে সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ না করে নির্মাণকাজ শুরুর বিষয়টি জানার পর তা বন্ধ করে দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মানজুরা মুশাররফ।

ভবনটি নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিষদের লিজ দেওয়া পুকুরের আয় ও অন্যান্য অর্থ ব্যবহার করে চেয়ারম্যান একক সিদ্ধান্তে নির্মাণকাজ শুরু করেন। যদিও চেয়ারম্যানের দাবি, জনস্বার্থে নিজের ব্যক্তিগত অর্থায়নে তিনি এ কাজ শুরু করেছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উত্তরগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের একটি জরাজীর্ণ ভবনে দীর্ঘদিন ধরে কৃষি ব্যাংকের স্থানীয় শাখার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অন্যত্র স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছিল। মূলত ব্যাংকটির কার্যক্রম ইউনিয়ন পরিষদে ধরে রাখতেই নতুন দোতলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন চেয়ারম্যান।

সরেজমিনে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, প্রস্তাবিত ভবনের জন্য রড দিয়ে কয়েকটি পিলারের কাজ করা হয়েছে। নির্মাণস্থলের আশপাশে নিম্নমানের খোয়া ও দুই ধরনের বালু রাখা রয়েছে। অথচ সরকারি জমিতে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশা অনুমোদন, ব্যয় প্রাক্কলন এবং টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই নির্মাণকাজ শুরু করা হয়।

এ বিষয়ে উত্তরগ্রাম ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি কুদ্দুস জানান, ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের ভবনটির নির্মাণকাজের জন্য তারা মিস্ত্রি ও শ্রমিক সরবরাহের চুক্তি করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের সঙ্গে ৩ লাখ টাকার চুক্তিতে তারা মিস্ত্রির দায়িত্ব নিয়েছেন। রড, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রী চেয়ারম্যান নিজেই সরবরাহ করছেন। তবে ভবনটি ১ হাজার ৮০০ বর্গফুট করার কথা শোনা যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে নতুন করে চুক্তি করতে হবে। মূল মিস্ত্রির ধারণা, ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের ভবনটি নির্মাণে অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে।

অন্যদিকে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক স্থানীয় বিএনপি নেতা নিজেকে ঠিকাদার পরিচয় দিয়ে বলেন, টেন্ডার ছাড়া কোনোভাবেই চেয়ারম্যানের এ ধরনের নির্মাণকাজ পরিচালনা করার সুযোগ নেই।

স্থানীয় রুবায়েত কবির হৃদয়সহ একাধিক ব্যক্তি জানান, জরাজীর্ণ ভবনের কারণে নিরাপত্তাঝুঁকি থাকায় কৃষি ব্যাংকটি অন্যত্র চলে যেতে চাচ্ছিল। ব্যাংকটির কার্যক্রম ধরে রাখতেই এলাকাবাসীর প্রয়োজনে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, ভবনটি চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত অর্থ এবং পরিষদের লিজ দেওয়া পুকুরের আয় দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে বলে তাঁরা শুনেছেন। ভবনের দোতলায় কৃষি ব্যাংক এবং নিচতলায় গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তাঁরা।

ইউপি সদস্য সাইদুর জানান, ইউনিয়ন পরিষদের একটি ভবন কৃষি ব্যাংককে ভাড়া দেওয়া ছিল। সেটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এ কাজের নির্দিষ্ট বাজেট কিংবা কীভাবে নির্মাণকাজ পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানেন না তিনি। এমনকি পরিষদ চত্বরে চলমান নির্মাণকাজ সম্পর্কে ইউনিয়ন পরিষদের সচিবও অবগত নন বলে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে উত্তরগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হাছান বলেন, সেখানে আপাতত কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। কাজ শুরু করলেও বিভিন্ন জটিলতার কারণে তা বন্ধ রাখা হয়েছে। যতটুকু কাজ হয়েছে, তাতে কোথাও থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি; নিজের ব্যক্তিগত টাকা দিয়েই কাজ করেছেন তিনি। তবে সরকারি জমিতে ব্যক্তিগত অর্থায়নে ভবন নির্মাণের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আর কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মানজুরা মুশাররফ জানান, প্রকল্পের রেজুলেশন অনুমোদন হলেও এখনো কোনো কোটেশন আহ্বান কিংবা ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়নি। ভবনের নকশাসহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে অনুমোদন বাকি রয়েছে। সরকারি জায়গায় ব্যক্তিগত অর্থায়নে ভবন নির্মাণেরও কোনো সুযোগ নেই।

তিনি আরও জানান, বিষয়টি জানার পরপরই নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কৃষি ব্যাংকের জন্য ওই স্থানে একটি প্রকল্পের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেটি অবশ্যই যথাযথ বিধিবিধান অনুসরণ করে বাস্তবায়ন করতে হবে। চেয়ারম্যান যেভাবে নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন, তা অন্যায় হয়েছে।

সচেতন মহলের মতে, সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের যেকোনো উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন ও বিধিবিধান মেনে চলা বাধ্যতামূলক। শুধু নির্মাণকাজ বন্ধ করেই বিষয়টি শেষ না করে, ভবন নির্মাণের উদ্যোগের বৈধতা এবং অর্থের উৎস খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।