সংবিধান ‘ছুড়ে ফেলা’ নিয়ে কী বলেছিলেন খালেদা জিয়া

সেদিন সংবিধান ‘ছুড়ে ফেলা’ নিয়ে ঠিক কী বলেছিলেন খালেদা জিয়া

বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল বা ‘ছুড়ে ফেলা’ নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুরোনো বক্তব্য আবারও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতারা দাবি করেছেন, খালেদা জিয়াও নাকি সংবিধান ছুঁড়ে ফেলার কথা বলেছিলেন। তবে এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও ভাষ্য নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।

সম্প্রতি কিছু রাজনৈতিক দল ও তরুণ নেতাদের পক্ষ থেকে বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল বা নতুন সংবিধান প্রণয়ের দাবি জোরালো হয়েছে। জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং বিএনপি-বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ। পার্থ প্রশ্ন রাখেন, “সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলব কেন? সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় একাত্তরের পরাজয়ের দলিল? সংবিধান নিয়ে এত উত্তেজনা কেন?”

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, “বাহাত্তরের সংবিধানের সঙ্গে লাখো শহীদের রক্তের ঋণ জড়িত। লাখো মা-বোনের সম্ভ্রম জড়িত। এই সংবিধানকে সামনে রেখেই সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।”

এর আগে ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদে এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, “জেন-জি’রা আর বাহাত্তরের সংবিধান চায় না।” পরদিন জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “যে সংবিধান খালেদা জিয়া ছুঁড়ে ফেলার কথা বলেছিলেন, সেই সংবিধানের প্রতি সরকারি দলের এত সমর্থন কেন, তা জনগণ জানতে চায়।” এরপর মঙ্গলবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের আলোচনায় জামায়াত ও এনসিপির আরও অনেক এমপি একই সুরে বক্তব্য রাখেন।

কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “সংসদে পার্থ যখন বললেন, যারা সংবিধান ছুঁড়ে ফেলতে চান তাদের স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে অ্যালাইনমেন্ট করেছেন; তখন সরকারি দলের মন্ত্রীরা হাততালি দিয়ে সমর্থন জানালেন। খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সংগ্রাম করেছেন। তিনি বলেছিলেন, যখন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন এই সংবিধানের সংশোধনী বা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হবে।” তিনি আরও বলেন, সরকারি মন্ত্রীরা যারা দীর্ঘদিন বেগম জিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, তাদের উচিত ভাবা যে সংবিধান ছুঁড়ে ফেলা ও স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে অ্যালাইনমেন্টের তুলনা দিয়ে বেগম জিয়াকে অপমান করা হয়েছে কি না।

আসলেই, ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে বিএনপি তীব্র বিরোধিতা করেছিল। ১৩ জুলাই এক গণঅনশন কর্মসূচিতে খালেদা জিয়া বলেন, “আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ বিভিন্ন সংশোধনী এনেছে। আমরা বলছি, এগুলো জনগণ মানে না। আগামী সরকার পরিবর্তনের পর এই সংশোধনীগুলো বাতিল করা হবে।” বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখানে তিনি পুরো সংবিধান নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু সংশোধনী বাতিলের কথাই উল্লেখ করেছিলেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য মওদুদ আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার বক্তব্যের অর্থ ছিল—তার দল ক্ষমতায় এলে পঞ্চদশ সংশোধনী পরিবর্তন করবে। সুতরাং, খালেদা জিয়া সরাসরি সংবিধান বাতিলের কথা বলেননি, বরং নির্দিষ্ট সংশোধনী বাতিলের কথাই বলেছেন। তাই তার বক্তব্যকে পুরো সংবিধান ‘ছুঁড়ে ফেলার’ আহ্বান হিসেবে দেখানো কতটা সঠিক, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।