ভোটারদের আশা: বিএনপির জয়ে নতুন বাংলাদেশ

বিএনপির বিজয়ে পরিবর্তনের বার্তা, ‘আরও ভালো বাংলাদেশ’ প্রত্যাশা

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন, শুক্রবার বিকেলে, ঢাকার গুলশানে বিএনপি কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় মোড় নিলেন রিকশাচালক আনোয়ার পাগলা। তার রিকশার এক পাশে জাতীয় পতাকা, অন্যপাশে বিএনপির দলীয় পতাকা ঝুলানো ছিল। আনোয়ার দলের একজন নিবেদিত সমর্থক। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, “লোকে আমাকে পাগল বলে, কারণ আমি মনে করি এই দলই আমার জীবনের সবকিছু। তবে লোকের মতামত কোনোভাবে প্রভাব ফেলে না। আমরা জিতেছি এবং বাংলাদেশ এখন আরও ভালো হবে।”

প্রায় দুই দশক পর বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফিরছে। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে দলটি নিরঙ্কুশ জয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের দিন ধার্য ১৭ ফেব্রুয়ারি।

শনিবার নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে। নির্বাচনে মধ্যডানপন্থি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২১২টিতে জয়ী হয়েছে। অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও দেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।

নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনের পরদিন সমর্থকদের সঙ্গে দেখা করে তিনি বলেন, “আপনারা যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।” নির্বাচনী প্রচারে বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরায় জোরালো হবে। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবারের ভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভোট গণনায় কিছু অসঙ্গতি ও কারচুপির অভিযোগ ওঠলেও, শনিবার নির্বাচনের ফলাফল জামায়াত স্বীকৃতি দিয়েছে।

বিগত সময়ে, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। দুই দশক পর তার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল আবার ক্ষমতায় ফিরল।

নির্বাচনের পর শুক্রবার গুলশানে বিএনপি কার্যালয়ের পাশে দলের কর্মী কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি ‘দমন-পীড়নের বছর’ স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “অনেক দিন মনে হয়েছিল শেখ হাসিনার শাসন কখনো শেষ হবে না। এবার মানুষ আমাদের দেশ শাসনের সুযোগ দিয়েছে।”

কামাল হোসেন আরও বলেন, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে, অনেক তরুণ বেকার। এই সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।

নির্বাচনের পরদিন ঢাকা শহর অস্বাভাবিকভাবে শান্ত ছিল। বিএনপি বিজয় মিছিল না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সঙ্গে মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও শান্ত ছিল। তবে কার্যালয়ের আশপাশে কিছু সমর্থক হতাশা প্রকাশ করেন। জামায়াত সমর্থক আবদুস সালাম অভিযোগ করেন, “ভোট গণনায় কৌশল ব্যবহার হয়েছে এবং সংবাদমাধ্যম আমাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাত করেছে।” জার্মানিতে বসবাসকারী জামায়াত সমর্থক মুয়াজ আবদুল্লাহ বলেন, “সংগঠনের ব্যর্থতার কারণে জামায়াত পরাজিত হয়েছে। অনেক এলাকায় তারা ভালো প্রচার করতে পারেনি, এবং কিছু ভোটকেন্দ্রে ঠিকমতো প্রতিনিধি ছিল না।”

বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন জোটে থাকলেও এ নির্বাচনে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। নির্বাচনী প্রচারে কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও, নির্বাচনের কয়েক মাস আগে অনলাইনে তীব্র বিভাজন দেখা গেছে।

বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বাইরে দলের কর্মী সুজন মিয়া মৈত্রী বলেন, “আমরা শত্রুতা চাই না। আমাদের দেশের উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া উচিত।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি মনে করেন, বিএনপির জয় বাংলাদেশের ডানপন্থার দিকে ঝুঁকির আশঙ্কা কমাতে সাহায্য করবে। তবে তিনি সতর্ক করেন, আসল পরীক্ষা এখন শুরু হয়েছে। ভালো শাসন নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বজায় রাখা এবং অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা প্রধান চ্যালেঞ্জ। এগুলো ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষার ভিত্তি।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, নতুন সরকার জনগণ ও বিরোধী দলের চাপের মুখে পুরোনো দমনমূলক বা প্রতিশোধমূলক রাজনীতিতে ফিরে গেলে গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা ব্যাহত হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফল সামগ্রিকভাবে পুরো অঞ্চলের জন্য তুলনামূলকভাবে কম টানাপোড়েন সৃষ্টি করবে। পাকিস্তান ও চীন বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার সম্ভাবনা দেখছে, তবে ভারত জামায়াতের চেয়ে বিএনপিকে বেশি পছন্দ করছে।