
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বেহালার একটি দুর্গাপূজা মণ্ডপ এ বছর সাজানো হয়েছে যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ ও মানবিক আর্তির প্রতীক হিসেবে। বেহালা ফ্রেন্ডস ক্লাবের আয়োজনে তৈরি এই সর্বজনীন পূজামণ্ডপের প্রতিপাদ্য গাজায় চলমান দমন-পীড়ন, দুর্ভিক্ষ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। কেবল শিল্পসৌন্দর্য নয়, বরং মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোই এ আয়োজনের মূল বার্তা।
শিল্পে প্রতিবাদ, প্রতিটি কোণে ফিলিস্তিনের দাবি
মণ্ডপের সাজসজ্জায় ফুটে উঠেছে স্বাধীন ফিলিস্তিনের আহ্বান। আয়োজকরা জানিয়েছেন, বাংলার ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সঙ্গে গাজার বর্তমান দুর্ভিক্ষের গভীর মিল রয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি যেমন লাখো মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তেমনি ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রচ্ছায়ায় খাদ্যরসদ আটকে রেখে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
নকশাকারী শিল্পী রাজনারায়ণ সন্ত্রা বলেন, “একসময় চিত্তপ্রসাদ ও জয়নুল আবেদিন ক্ষুধার্ত মানুষের ছবি এঁকে প্রতিবাদ করেছিলেন। আজ আমরা প্রতিমা আর শিল্পকর্ম দিয়ে সেই প্রতিবাদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছি।”
কবিতা, শিল্প ও প্রতীকের ভাষায় প্রতিবাদ
মণ্ডপের প্রবেশপথে ঝুলছে গাজাবাসী কবি নামা হাসানের আরবি কবিতা ‘ফেস টু ফেস’, যেখানে গাজার বিভীষিকার বর্ণনা আছে। এর বাংলা অনুবাদও লেখা হয়েছে দেয়ালে। কবিতার পাশেই রয়েছে ‘জেনোসাইড’ লেখা একটি চিত্রপট। অন্য দেয়ালে বড় করে লেখা— ‘ফিলিস্তিন মুক্তি পাক’।
মণ্ডপের মাঝখানে রাখা হয়েছে একটি প্রতীকী ভেন্ডিং মেশিন, যেখান থেকে কোমল পানীয় নয়, বের হচ্ছে অস্ত্র। ভেতরে বাজছে ফিলিস্তিনি নাট্যকার রিদা গাজালেহর কণ্ঠে গাজার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের বাস্তবতার বর্ণনা।
প্রতীকী নকশা ও দেবী রূপে নতুন আঙ্গিক
প্রবেশপথ তৈরি হয়েছে মানুষের পাঁজরের কাঠামো দিয়ে— যা দুর্ভিক্ষে মানবদেহের যন্ত্রণা বোঝাচ্ছে। ভেতরে ছাদ থেকে ঝুলছে চালভর্তি বস্তার ওপর চাপা বিশাল বল-প্রেস, যেন খাদ্য মজুদের ভয়ঙ্কর প্রতীক।
দেবী দুর্গা ও তার সন্তানদের প্রতিমাতেও আনা হয়েছে ভিন্নতা। জাঁকজমক সরিয়ে তাদের সাধারণ ও রুক্ষ রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। শিল্পী প্রদীপ দাস বলেন, “আমরা জানি এটি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে শিল্পী যদি সত্যকে তুলে না ধরেন, তবে তার শিল্পীর পরিচয়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।”
রাজনারায়ণ সন্ত্রা আরও বলেন, “শিল্পীর প্রতিবাদ সীমান্তে আটকে থাকে না। ২০২১ সালে যেমন রিহানা ও গ্রেটা থুনবার্গ ভারতের কৃষক আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনি আমরা আজ গাজার মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি।”
দর্শনার্থীদের প্রতিক্রিয়া
অনেক দর্শনার্থী জানিয়েছেন, পূজামণ্ডপে সাধারণত ধর্মীয় আঙ্গিকেই শিল্পীরা সীমাবদ্ধ থাকেন। কিন্তু এ আয়োজনে শিল্পীরা ভিন্ন পথে হেঁটে যুদ্ধবিরোধী বার্তাকে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসবের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন, যা এক নতুন দৃষ্টান্ত।