
মুফতী মুহিব্বুল্লাহ মাদানি কি তাহলে নিজেই নিজেকে অপহরণের নাটক সাজিয়েছেন? ঘটনা সত্য হলে একজন আলেম এতটা প্রতারণা করলেন কিভাবে? তার পক্ষে কথা বলে আমরাও কি তাহলে প্রতারিত হলাম? এখন কি তাহলে মুহিব্বুল্লাহ নিজেই তদন্তের মুখে পড়েছেন?
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
অপহরণের অভিযোগ এনে তোলপাড় করা গাজীপুরের টঙ্গীর টিঅ্যান্ডটি কলোনি জামে মসজিদের খতিব ৬০ বছর বয়সী মুফতি মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজী নিজেই এখন তদন্তের মুখে।
তিনি অপহরণের যে বর্ণনা দিয়েছেন, যে এলাকা থেকে যখন তুলে নেওয়ার কথা বলেছেন, সেই সময়ের সেই এলাকার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। এজাহারের বর্ণনার কোনো কিছুই এসব ফুটেজে নেই।
মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজী সামাজিক মাধ্যমে মাওলানা মুফতি মুহিব্বুল্লাহ মাদানী নামে বেশি পরিচিত।
তিনি দাবি করেছেন, তাকে গত ২২ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে টঙ্গীর শিলমুন এক্সিস লিংক সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড কনভার্সন সেন্টারের সামনে থেকে অপহরণ করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। পরদিন পঞ্চগড়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধারের কথা নিজেই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন।
গোটা একটি দিন নির্যাতন, কথিত অপহরণের আগে একের পর এক উড়ো চিঠি পাওয়ার কথাও বলেছেন তিনি, তবে তার এই বয়ান এবং বর্তমান অবস্থারও মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।
পঞ্চগড় থেকে গাজীপুর ফিরেই মুহিব্বুল্লাহ তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন।
এলাকাটির আশপাশে যে সাতটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছে দেশকাল নিউজ ডটকম, তাতে মুহিব্বুল্লাহকে দ্রুত বেগে হেঁটে যেতে দেখা গেছে, কিন্তু কেউ তাকে তুলে নিয়েছেন, এমন দৃশ্য দেখা যায়নি।
এই খতিব দাবি করেছেন, তাকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নেওয়া হয়। তবে তিনি যে সময়ের কথা বলেছেন, তার ১০ মিনিট পরেও কোনো অ্যাম্বুলেন্সের দেখা মেলেনি।
দেশকাল নিউজ ডটকমের অনুসন্ধান আর পুলিশের তদন্তও প্রায় একই রকম। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখন মুহিব্বুল্লাহই তদন্তের মুখে আছেন।
জানতে চাইলে টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মো. ওয়াহিদুজ্জামান দেশকাল নিউজ ডটকমকে বলেন, “এটি খুবই স্পর্শকাতর ঘটনা। সব দিক বিবেচনা করে তদন্ত চলছে। শেষ করে বিস্তারিত আমরা সংবাদ সম্মেলন করেই জানাব।”
অভিযোগ আর সিসিটিভি ফুটেজ ও বক্তব্যে ধারাবাহিকতার অভাবের বিষয়টি সামনে আসার পর মুহিব্বুল্লাহকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা সিআইডি জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। এরপর তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যে কারণে তার বক্তব্য চেষ্টা করেও পায়নি দেশকাল নিউজ ডটকম। টঙ্গীতে তার বাসায় গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কারও সাড়া মেলেনি।
এই ঘটনার বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ দেশকাল নিউজ ডটকমের হাতে এসেছে। তার মধ্যে মুহিব্বুল্লাহর বাসার ভেতরের উঠান ও বাইরের রাস্তা এবং মসজিদের সামনের মোট তিনটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সকাল ৬টা ৫২ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে তিনি ঘর থেকে বের হন।
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তিনি বাম হাতে দরজা খুলে বের হন, পেছন ফিরে তাকাননি এবং টিনের দরজাটি নিজে বন্ধ হয়ে যায়।
সকাল ৬টা ৫৩ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে তিনি মসজিদ ছাড়েন এবং প্রায় ৬টা ৫৪ মিনিটে টঙ্গী টু কালীগঞ্জগামী আঞ্চলিক সড়কে কালীগঞ্জের দিকে রওনা হন। পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা, মাথায় কালো রঙের পাগড়ি।
রাস্তা দুই পাশেই নানা ধরনের কারখানা, ভারী যানবাহনের চলাচল রয়েছে। বাস, প্রাইভেটকার, অটোরিকশা ছড়িয়ে থাকে। দুই পাশে ফুটপাত না থাকায় এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বের হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
মুহিব্বুল্লাহর বাসার অদূরে শিলমুন এক্সিস লিংক সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড কনভারশন সেন্টারের চারটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজেও এজাহারে উল্লেখিত অপহরণের বর্ণনার মিল পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে নেওয়া চারটি ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে মুহিব্বুল্লাহ পাম্পের সামনে দিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছেন। এই সময় উজ্জ্বল রোদের ঝলক এবং রাস্তায় অসংখ্য যানবাহন ছুটছে।
টঙ্গীর শিলমুন এক্সিস লিংক সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড কনভার্সন সেন্টারের সামনে থেকে অপহরণের দাবি করেছেন মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজী। তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেলে তিনি নিজেই হেঁটে গেছেন এই পথ দিয়ে।
ফিলিং স্টেশনের সামনে একটি অ্যাম্বুলেন্স পথরোধ করে তাকে অপহরণের যে দাবিটি করা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে এরকম কোনো ঘটনা দেখা যায়নি। বরং তাকে একাই দ্রুত গতিতে হেঁটে যেতে দেখা গেছে।
সামনের সেতুর উপরে পুলিশের স্থাপন করা সিসিটিভি ক্যামেরার যতদূর ফুটেজ পাওয়া যায়, ততদূর দেখা যায় মুহিব্বুল্লাহ একাই হাঁটছেন। অথচ এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, ফিলিং স্টেশনের সামনে তাকে অপহরণ করা হয়।
৬টা ৫৪ মিনিটে এলাকা থেকে রওনা হয়ে তিনি প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ফিলিং স্টেশনে পৌঁছান সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে। অর্থাৎ দুই কিলোমিটার পথ তিনি ২৪ মিনিটে পাড়ি দিয়েছেন।
সেই হিসেবে সিসিটিভি ফুটেজের ওই ১০ মিনিটে তিনি আরও প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটেছেন, যা ব্রিজের উপরের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে ধরা পড়েছে।
মুয়াজ্জিন সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, মুহিব্বুল্লাহ তাকে বলেছেন, সেতুর পরে ট্রাকস্ট্যান্ডের সামনে থেকে তাকে অপহরণ করা হয়েছে।
ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. সোলেইমান দেশকাল নিউজ ডটকমকে বলেন, “পুলিশ এসেও আমাদের সিসিটিভি থেকে তথ্য নিয়েছে। তিনবার বিভিন্ন পুলিশ এসেছিল। আমাদের ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে হুজুরকে অপহরণ করা হয়নি। তিনি একাই হেঁটে যাচ্ছিলেন, ভিডিওতে দেখেছি।”
মন্তব্য (0)
প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।