দেড় যুগ পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুসল্লিদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যাপক উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ হাতে নিচ্ছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এ লক্ষ্যে ১৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় মসজিদের তিনতলা পর্যন্ত আধুনিক চলন্ত সিঁড়ি স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি পূর্ব ও উত্তর দিকে ৮০ ফুট উচ্চতার দুটি ফটক নির্মাণ এবং উভয় পাশে ১৬৪ ফুট উঁচু দুটি মিনার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনতলা বিশিষ্ট আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণের পাশাপাশি নারীদের নামাজের স্থান আধুনিকায়ন করা হবে এবং দক্ষিণ দিকে তাদের জন্য আলাদা সিঁড়ি স্থাপন করা হবে। অজুখানা ও টয়লেট আধুনিক সংস্কারে আনা হবে।

এছাড়া পশ্চিম দিকে ২০ ফুট এবং উত্তর দিকে ৩৩ ফুট প্রশস্ত হাঁটার পথ নির্মাণ, চারতলা অফিস ভবন গড়ে তোলা, আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন, মসজিদের ভেতর ও বাইরে উন্নত আলোকসজ্জা, লিফট সংযোজন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (ভিআরএফ) স্থাপন, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে গাড়ি পার্কিং সংস্কারসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশি ও বিদেশি নান্দনিক মসজিদ পরিদর্শনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে বায়তুল মোকাররমকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হবে। ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে এবং পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পাওয়া গেছে। একনেকের অনুমোদন মিললে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

তবে পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবিত প্রকল্পে কিছু ব্যয় অযৌক্তিক উল্লেখ করে তা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে অন্যান্য ভাতা, আপ্যায়ন ব্যয়, কুরিয়ার সার্ভিস, অফিস ও স্টোর ভাড়া, আসবাব রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রুপ বিমাসহ কয়েকটি খাত অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব সুপারিশ মেনে ব্যয় সমন্বয় করে চূড়ান্তভাবে ১৯৯ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানায়, প্রাথমিকভাবে ১৩৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প প্রস্তাব করা হলেও পরবর্তীতে পরিসর বাড়ায় ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৯ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ১২৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে অনাবাসিক ভবন, মিনার ও ফটক নির্মাণে, ৩১ কোটি টাকা বিদ্যুৎ সংযোগে এবং ৭ কোটি টাকা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক (পরিকল্পনা বিভাগ) বজলুর রশীদ জানান, মদিনা শরিফের আদলে ছাতা স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়ায় সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা হয়েছে। তবে আধুনিক সুবিধা সংযোজনের মাধ্যমে মসজিদটিকে আন্তর্জাতিক মানে রূপ দেওয়ার কাজ চলবে। মুসল্লিদের জন্য পৃথক ও উন্নত টয়লেট ব্যবস্থা এবং নিচতলার মার্কেট এলাকায় আলাদা টয়লেট স্থাপনের কথাও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, ১৯৫৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের শিল্পপতি আবদুল লতিফ ইবরাহিম বাওয়ানি ঢাকায় বৃহৎ ধারণক্ষমতার একটি গ্র্যান্ড মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। সে অনুযায়ী ‘বায়তুল মোকাররম মসজিদ সোসাইটি’ গঠন এবং পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। বিশিষ্ট স্থপতি আবদুল হুসেন থারিয়ানি কাবা শরিফের আদলে মসজিদটির নকশা প্রণয়ন করেন।

১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৯৬২ সালের ২৬ ডিসেম্বর জুমার নামাজের মাধ্যমে মসজিদটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। বর্তমানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এই জাতীয় মসজিদেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষ, চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক, আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতার বাছাই পর্ব এবং একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার পরিচালিত হয়ে আসছে।