
কারসাজির মাধ্যমে মাত্র এক সপ্তাহে খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা বাড়িয়ে পেঁয়াজের দাম ১৪০ টাকায় পৌঁছে গেছে। এক মাসে বেড়েছে ৭০ টাকা। বাজারে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন কৃষক ও ভোক্তারা। তাদের দাবি, পরিকল্পিতভাবে দাম বাড়িয়ে আমদানির অনুমতি নেওয়ার ফাঁদ পেতেছে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র, যার ফলে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকায়।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবছর এই সময়েই পেঁয়াজের দাম বাড়ায় মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা। গত মৌসুমে কৃষকেরা ন্যায্য দাম না পেয়ে পেঁয়াজ বিক্রি করে ফেলেছেন, এখন পণ্যটি মজুতদারদের হাতে। এই সুযোগে তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়াচ্ছে এবং ভারত থেকে আমদানি অনুমোদনের জন্য সরকারকে চাপ দিচ্ছে।
পাবনার চাটমোহরের কৃষক বরকতউল্লাহ বলেন, “আমরা কষ্ট করে মাঠে পেঁয়াজ চাষ করেছি, শিগগিরই নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসবে। কিন্তু এখন যদি আমদানি শুরু হয়, আমরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ব।”
রাজধানীর কাওরান বাজার, নয়াবাজার, মালিবাগ ও রামপুরা কাঁচাবাজারে বৃহস্পতিবার দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৭০–৮০ টাকা। পাড়া-মহল্লার দোকানে এর দাম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। পাইকারি বাজারেও একই চিত্র—শ্যামবাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ১০৫ থেকে ১১৫ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল ৫০–৫৫ টাকা।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, “আড়তদার, কমিশন এজেন্ট ও দাদন ব্যবসায়ীরা মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। দেশে উৎপাদন ভালো হলেও তারা আমদানির পাঁয়তারা করছে। মৌসুমে আমদানি হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর নজরদারি না বাড়ালে ভোক্তার পকেট কাটবে।”
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ৩৫ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা থাকলেও গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ৩৮ লাখ টন—অর্থাৎ কোনো ঘাটতি নেই। তবু কিছু ব্যবসায়ী আইপি (ইমপোর্ট পারমিট) পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন, ইতোমধ্যে তারা ২৮০০ আবেদন জমা দিয়েছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদুর রহমান বলেন, “গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ নভেম্বরে বাজারে আসবে। এখন আমদানির অনুমতি দিলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে চাই, পাশাপাশি ভোক্তার খরচ নিয়ন্ত্রণেও নজর রাখছি।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকের সঙ্গে যোগসাজশে আইপি ছাড়া এলসি খুলে পেঁয়াজ আনার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আইপি না থাকায় তা আটকে দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন তারা দাম বাড়িয়ে সরকারকে চাপ দিচ্ছে। ইতোমধ্যে হাইকোর্টে ১৪টি রিট করা হলেও ৮টি খারিজ হয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হঠাৎ করে দাম বাড়ার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তিন স্তরে মূল্য বিশ্লেষণ চলছে, এবং দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
সংক্ষেপে:
🔸 এক সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে ৪০ টাকা
🔸 সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃত্রিম সংকট
🔸 কৃষক ক্ষতির আশঙ্কা, ভোক্তার পকেট কাটা
🔸 প্রশাসন নীরব, নজরদারি দুর্বল
🔸 আইপি ছাড়া আমদানি চেষ্টায় ব্যবসায়ীদের রিট