রাতে দুই গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা

image 193

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির অন্যতম নেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে যখন জাতি গভীর শোক ও ক্ষোভে ভারাক্রান্ত, ঠিক সেই সময় দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশের শীর্ষ দুটি গণমাধ্যম—প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার—এর কার্যালয়ে একযোগে ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয়।

হামলায় অফিসের ভেতরের সবকিছু তছনছ হয়ে যায়। ফলে গতকাল শুক্রবার কোনো পত্রিকাই প্রকাশিত হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকে উভয় পত্রিকার অনলাইন কার্যক্রমও। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হামলার শিকার হন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক বর্ষীয়ান সাংবাদিক নূরুল কবির।

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘কালো দিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, আসন্ন নির্বাচনকে ব্যাহত করতে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তি দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

এ ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও শিথিলতার অভিযোগ উঠেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এক বিবৃতিতে জানায়, ‘ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও নিউ এজের সাংবাদিকদের আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই—আমরা আপনাদের পাশে আছি। সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানেই সত্যের ওপর হামলা। আমরা পূর্ণ ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিচ্ছি।’

উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পল্টনে গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত পৌনে ১০টার দিকে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। হাদির মৃত্যুসংবাদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রথমে প্রথম আলো এবং কিছুক্ষণ পর ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। প্রথম আলোর কর্মীরা কোনোমতে বের হতে পারলেও ডেইলি স্টারের বেশ কয়েকজন কর্মী দীর্ঘ সময় ধরে ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে জীবনমৃত্যুর মুখে পড়েন।

গতকাল সকালে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর তোপখানা রোডে অবস্থিত উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সন্ধ্যা ৭টার দিকে একদল ব্যক্তি কার্যালয়ে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায় এবং পরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, সন্ধ্যা ৭টা ৪২ মিনিটে আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। প্রথম ইউনিট পৌঁছে ৭টা ৪৭ মিনিটে এবং মোট চারটি ইউনিটের চেষ্টায় রাত ৮টা ১৩ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান, ঘটনাটির কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। এটি পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ নাকি অন্য কোনো কারণে আগুন লেগেছে—তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।