বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার উত্থান ও পতন যেভাবে

image 252

ভারতে অবস্থান করেই জানতে হলো—বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, আর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তার নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় সরকারপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় থাকা নারী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পথচলা ছিল নাটকীয় উত্থান-পতনে ভরপুর।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ৪৫ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবল প্রভাব বজায় রেখেছেন তিনি—কখনো আওয়ামী লীগ সভাপতি, কখনো বিরোধী দলীয় নেত্রী, আবার কখনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলে তার নাম আসবেই।”

সমালোচকদের দাবি, ৭৬ বছর বয়সী শেখ হাসিনা দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা ৪৪ বছরের সময়কালে নেওয়া নানা সিদ্ধান্তের কারণেই আজ দলটি টিকে থাকার সংকটে পড়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলটির ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলেছেন বিরোধীরাও।

ভারতে থাকাকালীন আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত

১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলেও দেশের বাইরে থাকায় রেহাই পান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। সেই সময় কোণঠাসা হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ। ১৯৭৬ সালে নতুন নিবন্ধন নিয়ে আবার রাজনৈতিক মাঠে নামলেও নেতৃত্ব সংকটে পড়ে দলটি। পরে আব্দুর রাজ্জাক, ড. কামাল হোসেন ও বেগম জোহরা তাজউদ্দিনের উদ্যোগে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে দলীয় নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারির সম্মেলনে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়—তখনও তিনি ভারতে স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন। দুই মাস পর দেশে ফিরেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হওয়ায় শেখ হাসিনাকে দল সহজেই গ্রহণ করে। একই সঙ্গে তার মধ্যকার নেতৃত্বের স্বাভাবিক গুণও তাকে প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও তার সক্রিয় ভূমিকা তাকে জনসমর্থন এনে দেয়।

বিরোধী দলীয় নেত্রী, গ্রেনেড হামলা ও গ্রেফতার

১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয় নিয়ে আশাবাদী থাকলেও আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়ে সংসদে যায়, শেখ হাসিনা হন দেশের প্রথম নারী বিরোধী দলীয় নেত্রী।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর আন্দোলন শুরু করলে একই বছরের জুনে ভোটে জয়ী হয়ে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। মেয়াদ শেষে ২০০১ সালে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

২০০৪ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার শিকার হন তিনি—নিহত হন ২৪ জন।
২০০৭ সালের রাজনৈতিক সহিংসতা, জরুরি অবস্থা এবং আলোচিত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার সময় চাঁদাবাজির মামলায় প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান শেখ হাসিনা।

টানা সাড়ে ১৬ বছর ক্ষমতায়

২০০৮ সালের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে আবার ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এর পরপরই ঘটে আলোচিত বিডিআর বিদ্রোহ— যেখানে ৫৭ সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। সেই সময় সরকারের ভূমিকা নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে।

একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকার শুরু করে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার—যার বেশিরভাগ অভিযোগ ছিল জামায়াত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।
২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বর আন্দোলন, ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন—সবগুলোই বলপ্রয়োগে দমন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনেও একই ধরনের দমন-পীড়ন হয়। সরকারি হিসেবে নিহত ৮৪৪, জাতিসংঘের হিসেবে ১,৪০০ মানুষ প্রাণ হারান অল্প কিছুদিনে। এই সহিংসতা থেকেই আন্দোলন সরকার–বিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল ও বিতর্কিত নির্বাচন

সমালোচকদের বড় অভিযোগ—তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে শেখ হাসিনা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করেছেন।
মহিউদ্দিন আহমদের মতে, শেখ হাসিনা “নিরঙ্কুশ ক্ষমতা” চান, এবং আদালতের সিদ্ধান্তকে হাতিয়ার করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করেছিলেন। এরপরের তিনটি নির্বাচন—২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—সবকটাই একতরফা, আগের রাতে ব্যালটভর্তি বা ডামি প্রার্থী দাঁড় করানোর মতো অভিযোগে বিতর্কিত হয়।

এ সময় বাড়তে থাকে বিচারবহির্ভূত গুম-খুন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ। যদিও পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বড় প্রকল্পের জন্য প্রশংসাও পান তিনি।

আবার রাজনীতিতে ফেরা সম্ভব?

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক কিছু নির্ভর করবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক শক্তির ওপর। মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “যদি নতুন কেউ এসে হাসিনার চেয়েও খারাপ করে, তাহলে তার ফিরতে পারার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।”