গণঅভ্যুত্থানের ১৫ মাসে কারা হেফাজতে ১১২ জনের মৃত্যু

image 179

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের আগে যেমন প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ কারা হেফাজতে মারা যেতেন, অভ্যুত্থানের পরও সেই চিত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। নিহতদের পরিবারগুলোর অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই তাদের স্বজনদের মৃত্যু হয়েছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দাবি, হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ধরনের মৃত্যুকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ গত ২৯ নভেম্বর রাতে কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। সোনালি ব্যাংকের সাড়ে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তানভীর দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে সেদিন বিকেলে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

তানভীরের পরিবারের অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। তার ভাই শামীম আল মামুন বলেন, অসুস্থ বন্দিদের কারাগারে ফেলে রাখা হয়, পর্যাপ্ত খাবার ও চিকিৎসা দেওয়া হয় না এবং হাই সিকিউরিটিতে নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা উত্তরের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা লীগের সভাপতি মনোয়ারা মজলিশের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও। তিনি গত ২৬ নভেম্বর কাশিমপুর মহিলা কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। তার পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে নেওয়ার পরও ঠিকমতো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। মৃত মনোয়ারার স্বামী মজলিস মিয়া বলেন, কিডনির সমস্যা থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা তিনি পাননি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ১৫ মাসে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ১১২ জন। চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই এই সংখ্যা ৯৫ জন, যেখানে ২০২৪ সালের পুরো ১২ মাসে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬৫। গত পাঁচ বছরে কারা হেফাজতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৪১২ জন।

কারা হেফাজতে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া বন্দিদের বড় একটি অংশই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। গত সেপ্টেম্বরে সাবেক এক শিল্পমন্ত্রীর হাতকড়া পরা অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অসুস্থ বন্দিদের মানবাধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, কারাগার থেকে আনা বন্দিদের চিকিৎসায় অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ডিভিশনপ্রাপ্ত না হয়েও অনেক বন্দি ডিভিশনের সুযোগ-সুবিধা দাবি করেন। তা না পেলে তারা অভিযোগ করেন, যদিও চিকিৎসা প্রয়োজন না থাকলে হাসপাতালে রাখার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, কারাগারে চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে ৪১ জন আবাসিক চিকিৎসকের মধ্যে মাত্র দুইজন দায়িত্বে আছেন এবং পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধাও নেই। এ কারণে জরুরি অবস্থায় বন্দিদের বাইরে হাসপাতালে নিতে সময় লাগে। তবে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, কোনো গাফিলতি প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

মানবাধিকার সংগঠন নাগরিক উদ্যোগের মতে, অভ্যুত্থানের আগে ও পর—দুই সময়েই কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক। সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, অভ্যুত্থানের মূল চেতনা লঙ্ঘিত হচ্ছে। আগের সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, কিন্তু নতুন সরকার আসার পরও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।

বন্দিদের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে কারাগারে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নিয়মিত পরিদর্শনসহ কার্যকর নজরদারির ব্যবস্থা জরুরি বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।