
বর্তমান সমাজে অনেকেই অভিযোগ করেন যে, ইসলাম নারীদের বঞ্চিত করেছে; কারণ পুরুষদের উত্তরাধিকার দ্বিগুণ, আর নারীদের অর্ধেক। তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলাম নারীর প্রতি কোনো অন্যায় করেনি। বরং এটি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং ন্যায্য উত্তরাধিকার ব্যবস্থা প্রদান করেছে, যা দায়িত্ব ও অধিকার উভয়ের সঠিক সমন্বয় নিশ্চিত করে।
নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা:
ইসলাম নারীর সম্মান, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। পুরুষের দ্বিগুণ অংশ কোনো বৈষম্য নয়; এটি দায়িত্বের ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিফলন। ইসলামী উত্তরাধিকার আইন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত আর্থিক বণ্টন ব্যবস্থা, যা পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক ন্যায়ের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটায়।
মীরাছ: ন্যায়সঙ্গত বণ্টন
মীরাছ বা উত্তরাধিকার সমাজে অসন্তোষ সৃষ্টি নয়, বরং ঐক্য ও ন্যায়ের বীজ বপন করে। এটি ধনীকে দায়িত্বের বিষয় মনে করায় এবং গরিবকে অধিকার নিশ্চিত করে। পুরুষকে শেখায় দায়িত্ব ও ত্যাগ, নারীকে দেয় নিরাপত্তা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ
“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের বিষয়ে নির্দেশ দেন — ছেলের জন্য রয়েছে দুটি কন্যার সমান অংশ।” (সূরা আন-নিসা: আয়াত ১১)
এটি বৈষম্য নয়; কারণ ইসলামে অর্থনৈতিক দায়িত্ব পুরুষের ওপর, নারীর ওপর নয়।
দায়িত্ব ও অধিকার
পুরুষের দায়িত্ব হলো: স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের পূর্ণ খরচ চালানো, স্ত্রীকে মহর প্রদান এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
ٱلرِّجَالُ قَوَّٰمُونَ عَلَى ٱلنِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ ٱللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَآ أَنفَقُوا۟ مِنْ أَمْوَٰلِهِمْ
“পুরুষ নারীদের রক্ষণাবেক্ষণকারী, কারণ আল্লাহ তাদের কিছু গুণে শ্রেষ্ঠ করেছেন এবং তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে।” (সূরা আন-নিসা: আয়াত ৩৪)
পুরুষের দ্বিগুণ অংশ আসলে তার অতিরিক্ত দায়িত্বের প্রতিফলন।
নারীর সম্পদের স্বাধীনতা
নারী তার উপার্জন, উপহার বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের পূর্ণ মালিক। স্বামী, পিতা বা ভাই কারও অনুমতি ছাড়া তা ব্যবহার করতে পারে না। সে চাইলে নিজের ইচ্ছামতো খরচ, দান বা সঞ্চয় করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
خُذِي فِي مَالِكِ مَا يَكْفِيكِ وَوَلَدَكْ بِالْمَعْرُوفِ
“তুমি তোমার সম্পদ থেকে তোমার এবং সন্তানের জন্য যথাযথ ব্যয় করো।” (বুখারি ৫৩৬৪)
নারী কখনও বেশি পেতে পারেন
নারী সবসময় পুরুষের অর্ধেক পায়—এটা ভুল ধারণা। কুরআনে অন্তত ৩৪টি পরিস্থিতি বর্ণিত, যেখানে:
- কখনও নারী সমান পায়,
- কখনও বেশি পায়,
- কখনও একাই উত্তরাধিকারী হয়।
যেমন, কোনো মৃত সন্তানের একমাত্র উত্তরাধিকারী মা হলে সে এক-তৃতীয়াংশ (⅓) পায়।
ইসলামের বিপ্লবী অবদান
ইসলামের আগ পর্যন্ত আরব সমাজে নারীর উত্তরাধিকার ছিল না। ইসলামই নারীকে সম্পদের অধিকার, সম্মান ও আত্মমর্যাদা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ ٱلْوَٰلِدَانِ وَٱلْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَآءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ ٱلْوَٰلِدَانِ وَٱلْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ ۚ نَصِيبًۭا مَّفْرُوضًۭا
“পিতা-মাতা ও আত্মীয়রা যা রেখে যান, তাতে পুরুষদের যেমন অংশ রয়েছে, তেমনি নারীদেরও নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে—অল্প হোক বা বেশি।” (সূরা আন-নিসা: আয়াত ৭)
উপসংহার
ইসলাম নারীদের ঠকায়নি। বরং তাদের সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা দিয়েছে। পুরুষের দ্বিগুণ অংশ কোনো বৈষম্য নয়; এটি দায়িত্বের ভারসাম্য। এই ব্যবস্থা পরিবারে ন্যায়ের, সহযোগিতা ও ভালোবাসার পরিবেশ নিশ্চিত করে, যেখানে নারী তার সম্পদে নিরাপদ, আর পুরুষ তার দায়িত্বে সম্মানিত।