৩০ বছরের বন্দিদশা শেষে মুক্তি পেলেন রাহেলা বেগম

image 158

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার দিঘা গ্রামের রাহেলা বেগমের জীবন ৩০ বছর ধরে কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে কেটে গেছে—যেখানে অন্যরা পরিবার, সন্তান, স্বপ্ন আর জীবনের নানা আনন্দ–দুঃখের মধ্য দিয়ে বয়স বাড়ায়, তার জীবন সেই দীর্ঘ সময় অন্ধকারে কাটে।

রাহেলা বেগম এখন ৬৫ বছর বয়সী। ১৯৯৮ সালে এক হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার দীর্ঘ বন্দিজীবন শুরু হয়। কারাগারে প্রবেশের সময় তিনি ছিলেন মধ্যবয়সী—চুলে কালো রং, শরীরে শক্তি, চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। আজ তিনি একজন বৃদ্ধা; চুল সাদা, শরীর ভেঙে পড়েছে, স্মৃতিশক্তিও কমে গেছে। অনেক সময় নিজের প্রতিবেশীদেরও চিনতে পারেন না। তবু তিন দশক ধরে তিনি মুক্ত আকাশে শ্বাস নেওয়ার স্বপ্নে বেঁচে ছিলেন।

কারাগারে কাটানো দিনগুলোর কথা বলার সময় রাহেলা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, “জেলে যাওয়ার পর কাঁথা সেলাই করতাম। পুলিশরা কাঁথা দিত, আমি সেলাই করতাম। কিন্তু দিন যত যেত, তত অস্থির লাগত। জেলখানার একেক দিন আমার কাছে একেক বছরের মতো মনে হতো। মনে হতো দম বের হয়ে যাবে।”

তিনি আরও বলেন, “চার দেয়ালের ভেতরে জীবন আর সংসারের কোনো হিসাব মিলত না। খুব কাঁদতাম। এখন শুধু চাই সরকার আমার দিকে একটু নজর দেয়।” এই কথা বলতেই তিনি আবার অঝোরে কাঁদতে থাকেন।

রাহেলার বড় বোন সাহেলা বেগম বলেন, “এই পৃথিবীতে রাহেলার আপন বলতে এখন আমি ছাড়া আর কেউ নেই। জেলে থাকা অবস্থায় আমাদের বাবা–মা মারা গেছেন। তার স্বামী অন্যত্র সংসার গড়েছেন। জীবনের শেষ সময়ে সে এখন আমার বাড়িতেই আছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “সরকারিভাবে যদি কোনো সহযোগিতা পাওয়া যেত, তাহলে জীবনের শেষ সময়ে আমার বোন অন্তত খেয়ে–পরে বেঁচে থাকতে পারত। সমাজের বিত্তবানদের কাছেও আমি মানবিক দৃষ্টিতে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানাই।”

নওগাঁ জেলা কারাগারের সুপার রত্না রায় জানান, রাহেলা বেগমের সশ্রম কারাদণ্ডের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছিল। কিন্তু আদালতের ধার্য করা ৫,৫০০ টাকা জরিমানা পরিশোধ করতে না পারায় তার মুক্তি আটকে ছিল। কারা মহাপরিদর্শকের নির্দেশনায় এই অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হলে, গত ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “জীবনের বাকি সময়টা যেন তিনি স্বাভাবিকভাবে কাটাতে পারেন।”

অবশেষে একজন মানবিক কর্মকর্তার উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহায়তায় তিন দশকের বন্দিজীবনের অবসান ঘটে রাহেলা বেগমের। কারাগারের লোহার ফটক পেরিয়ে বাইরে বেরোনোর সময় তার চোখে ছিল বিস্ময়, মুখে অশ্রু, বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস।

রাহেলার মুক্তি কেবল একজন বন্দির মুক্তি নয়; এটি সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলনও বটে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই বৃদ্ধার পাশে রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা দাঁড়াবে—এটাই এখন দেখার বিষয়।