যেসব কারণে জাকসুতেও শিবিরের ভূমিধস বিজয়

web1

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল ব্যাপক বিজয় অর্জন করেছে। কেন্দ্রীয় সংসদের মোট ২৫টি পদে ভোট গ্রহণ শেষে দেখা যায়, জিএসসহ (সাধারণ সম্পাদক) ২০টি গুরুত্বপূর্ণ পদে জয় পেয়েছে এই জোট। তবে দীর্ঘদিন পর শিবিরের এমন সাফল্যের নেপথ্যে কী কারণ রয়েছে, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

পটভূমি ও শিবিরের প্রত্যাবর্তন

১৯৮৯ সালের ২৫ আগস্ট জাবিতে শিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষে নিহত হন ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রহমান কবির। সেই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২টি সংগঠন ক্যাম্পাসে শিবিরকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে। প্রায় ৩৫ বছর প্রকাশ্যে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পর ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছরের নভেম্বরে জাবি ক্যাম্পাসে ফের সক্রিয় হয় শিবির। এরপরই তারা ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ নামে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল নিয়ে জাকসু নির্বাচনে অংশ নেয়।

নেতিবাচক ভাবমূর্তি কাটাতে উদ্যোগ

কবির হত্যাকাণ্ড, নারী নিরাপত্তা ও পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ দূর করতে শিবির গত এক বছরে নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম হাতে নেয়। এর মধ্যে হেলথ ক্যাম্প আয়োজন, যেখানে পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ নারী স্বেচ্ছাসেবী রাখা হয়, শিক্ষা বৃত্তি, শীতবস্ত্র বিতরণ, বিজয় দিবস উপলক্ষে কুইজ, অসুস্থদের সহায়তা, কোরআন শরিফ বিতরণ ও কোরবানির ঈদে শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের আয়োজন ছিল উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া প্যানেলে রাখা হয় ছয়জন নারী প্রার্থী, যদিও সবাই সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

জনপ্রিয়তা অর্জনের কৌশল

শিবির প্রার্থীদের অনেকেই আগে থেকেই বিভিন্ন সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন—যেমন বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, ডিবেট অর্গানাইজেশন (জেইউডিও), প্রেস ক্লাব, সাংবাদিক সমিতি, পথশিশুদের স্কুল ‘তরী’, সায়েন্স ক্লাব ও কালচারাল ক্লাব। এসব সংযোগের কারণেই তারা সহজে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং ভোটে সুবিধা পান।

শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া

ফলাফল ঘোষণার পর ক্যাম্পাসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

  • কেউ কেউ মনে করছেন, শিক্ষা-সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট পদগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা প্রার্থীরা হারায় যোগ্য নেতৃত্ব আসবে না।
  • আবার অনেকেই বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিবিরের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে শিক্ষার্থীবান্ধব হওয়ায় তারা আশার আলো দেখছেন।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আ. র. ক. রাসেল বলেন, “শিবিরের অতীত কর্মকাণ্ডে নারী অধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিতর্কিত অবস্থানের উদাহরণ আছে। তাই উদ্বেগ থেকেই যায়।”

অন্যদিকে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সাদমান সাকিব সৌমিক মনে করেন, “তারা এখন তুলনামূলকভাবে মুক্তচিন্তা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহারেও তারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা না দিয়ে নতুনভাবে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।”

নির্বাচিত নেতাদের বক্তব্য

জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেন, “আমরা সাংগঠনিকভাবে সুশৃঙ্খল ছিলাম, বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম করেছি—এ কারণেই শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করেছি। সাংস্কৃতিক ধারায় কোনো বাধা আসবে না। আমরা সবাইকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গবেষণা এগিয়ে নিতে চাই।”

উপসংহার

জাহাঙ্গীরনগরকে ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ বলা হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল ধারার ঐতিহ্য লালন করে আসছে। শিবিরের একচেটিয়া বিজয়ের পর কেউ কেউ এই ধারা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করলেও, অনেকে মনে করছেন নতুন নেতৃত্ব হয়তো ভিন্নমাত্রার সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে। এখন শিক্ষার্থীরা তাকিয়ে আছে, নির্বাচিত নেতৃত্ব কিভাবে এই আস্থা ও দায়িত্বকে সামলে নেয়।