
একটি জাতির ভবিষ্যৎ তখনই ঝুঁকির মুখে পড়ে, যখন তার তরুণেরা রাজনীতি নিয়ে উদাসীন থাকে। SANEM–ActionAid–এর সর্বশেষ জরিপ আমাদের সামনে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশের ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ৮৩% রাজনীতি এবং ভোটের বিষয়ে সম্পূর্ণ অনাগ্রহী!
এই সংখ্যাটি নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি নীরব বিপর্যয়ের সংকেত।
তবে, এই শূন্যতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্ভাবনা যদি তারা এটাকে সঠিকভাবে নেভিগেট করতে পারে। এজন্য তাদের সামনে সময় আছে আর কয়েক মাস।
৮৩% যারা রাজনীতি বিমুখ, তারা আসলে কী চায়?
• তারা সংলাপ চায়, দলীয় লড়াই নয়
• তারা সমাধান চায়, স্লোগান নয়
• তারা ভবিষ্যৎ চায়, অতীতের স্মৃতি নয়
তারা ক্ষুব্ধ—বেকারত্বে, শিক্ষা সংকটে, মাদকের দৌরাত্ম্যে, আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা প্রতারণায় ক্লান্ত। তাদের কাছে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের তীব্র প্রচার অথবা বিরোধীতা দুটিই একঘেয়ে মনে হয়। তারা বিকল্প খুঁজছে।
আর এখন, সেই বিকল্প হতে পারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যদি দলটি সময়োচিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের সাহস দেখায়।
জামায়াত কীভাবে এই ৮৩% তরুণকে মোবিলাইজ করতে পারে?
১️। কেবল আদর্শিক উপদেশ নয়, প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আসতে হবেঃ-
তরুণদের হৃদয়ে প্রবেশ করতে চাইলে “ইসলামী রাষ্ট্রনীতি” নয়, বরং “ইসলামী ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জনকল্যাণ”-এর বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরতে হবে। মনে রাখতে হবে, নীতি নয়, উদাহরণ চায় এই তরুণ সমাজ। একবিংশ শতাব্দীর ভাষায় বলতে গেলে, আবেগ নয়, প্রমাণ দিন।
তবে এই কাজগুলো বিচ্ছিন্নভাবে করে গেলে হবেনা। একটা স্ট্র্যাটেজিক কম্যুনিকেশনের অংশ হিসেবে এই কাজগুলো একটা ন্যারেটিভ আকারে বিল্ড করতে হবে যেন তরুণদের টপ অফ দ্যা মাইন্ডে একটা লঙ লাস্টিং ইমপ্যাক্ট তৈরি করা যায়।
তরুণরা যেন তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এই কাজগুলোকে ডিসিশন মেকিং ফ্যাক্টর হিসেবে রিকল করতে পারে এবং তাদের ডিসিশন মেকিংকে এসব কাজ প্রভাবিত করতে পারে। বিচ্ছিন্নভাবে করে গেলে তা অল্প সময়ে স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়।
২। ডিজিটাল ন্যারেটিভে আধিপত্য তৈরি করতে হবেঃ-
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক—এসব প্ল্যাটফর্মকে সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হবে। ড্রামাটিক শর্টফর্ম ভিডিও, রিলস, ইনফোগ্রাফিক—সবকিছুতেই ইসলামিক জাস্টিস, রাজনৈতিক বিকল্প, ও তরুণদের সম্ভাবনা তুলে ধরতে হবে। হাত ঝুলিয়ে বক্তব্যের মাধ্যমে নয়, বরং তরুণদের সাথে নিয়ে দেশের বিভিন্নপ্রান্তে নির্দিষ্ট এলাকার তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার বিচারে টেইলর মেইড ক্যাম্পেইন এবং এঙ্গেজমেন্ট করতে হবে এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে তা ছড়িয়ে দিতে হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, এই কাজগুলো একটা ন্যারেটিভ আকারে বিল্ড করতে হবে যেন তরুণদের টপ অফ দ্যা মাইন্ডে একটা লঙ লাস্টিং ইমপ্যাক্ট তৈরি করা যায়।
৩। জাতীয় ইস্যুতে সাহসী কণ্ঠস্বর হতে হবেঃ-
গু’ম, গ্রেফ’তার, দুর্নীতি, ভোটা’ধিকার—তরুণদের হৃদয়ের স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে সামনের কাতারে থাকতে হবে। শুধু স্টেটমেন্ট নয়, প্রতীকী অ্যাক’শন নিতে হবে, যেমন শৈল্পিক প্রতিবাদ, অনলাইন ক্যাম্পেইন, কিংবা বেকার যুবকদের নিয়ে কর্মশালা ইত্যাদি।
৪। “আমি জামায়াত করি না, কিন্তু…” এই জায়গায় পৌঁছাতে হবেঃ-

এই বাক্যটাই আজকের রাজনীতির “গ্রে জোন”। এই শ্রেণির তরুণদের আস্থা অর্জন করলেই—তারা একদিন মাঠেও নামবে, ব্যালটেও সিদ্ধান্ত নেবে।
জরিপে দেখা যায়—রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ১৭% তরুণদের মধ্যেঃ-
• BNP-এর প্রতি সমর্থন: ৩৮.৭৬%
• জামায়াতের প্রতি সমর্থন: ২১.৪৫%
• NCP (নাগরিক দল): ১৪–১৭%
অর্থাৎ এখনো দ্বিতীয় সর্বোচ্চ যুব সমর্থন জামায়াতের প্রতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ২১.৪৫%–এর বাইরে থাকা ৮৩% নিষ্ক্রিয় তরুণদের মন জয় করবে কে?
জামায়াত যদি নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোকে তরুণবান্ধব, স্মার্ট, আধুনিক এবং সক্রিয় করে তোলে—তাহলে এই নীরব ৮৩%–এর হৃদয়ের ভাষা বুঝে তাদের জাগানো অসম্ভব নয়। তারা ভোট দেবে, তারা মিছিলেও নামবে—শুধু তাদের হৃদয়ে আলো জ্বালাতে হবে।
সময় এসেছে জামায়াতের জন্য কেবল “ধর্মভিত্তিক দল” পরিচয়ের চেয়ে বড় কিছু হয়ে ওঠার— সময় এসেছে “তারুণ্যের রাজনৈতিক অভিভাবক” হয়ে ওঠার।