গৃহবধূ থেকে নেতৃত্বে: যেভাবে বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া

image 257

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া আর নেই। ৮০ বছর বয়সে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ব্যক্তিজীবনে রাজনীতি থেকে দূরে থাকা এক গৃহিণী হিসেবেই তার জীবন শুরু। সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কোনো আগ্রহ তার ছিল না। তবে এক করুণ ও নাটকীয় পরিস্থিতিতে—স্বামী, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর—তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন।

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র হিসেবে খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতির মাঠে নেমে মাত্র এক দশকের মধ্যেই বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়ে যান।

তার নেতৃত্বে বিএনপির প্রথম সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে দেশে পুনরায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু হয়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে বিএনপি চরম সংকটে পড়ে। দলীয় ভাঙন, নেতৃত্ব সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সেই সময়ে দলকে টিকিয়ে রাখতে খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে জন্ম নেওয়া বিএনপিকে একটি কার্যকর ও সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেন খালেদা জিয়া। তবে তার নেতৃত্বাধীন বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনাও ছিল।

পুতুল থেকে খালেদা জিয়া

মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বিধবা হন খালেদা জিয়া। তখন তিনি ছিলেন দুই সন্তান—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে নিয়ে সংসার সামলানো এক সাধারণ গৃহবধূ। তার প্রকৃত নাম ছিল খালেদা খানম, আর পরিবারের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘পুতুল’ নামে।

১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি খালেদা জিয়া নাম গ্রহণ করেন। রাজনীতিতে প্রবেশের পর এই নামেই তিনি সর্বজনপরিচিত হয়ে ওঠেন।

তার বড় বোন সেলিমা ইসলাম জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়েও খালেদা জিয়া কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না। রাজনীতি তার পরিকল্পনার অংশ ছিল না।

সমালোচকদের কেউ কেউ দাবি করেন, স্বামীর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রেই তিনি বিএনপির নেতৃত্বে আসেন। তবে সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ তার জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, পুরুষশাসিত সমাজে অল্প বয়সে বিধবা হয়ে খালেদা জিয়া যোগ্যতা ও দৃঢ়তার মাধ্যমেই রাজনৈতিক নেতৃত্বে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।

বিপর্যস্ত দলে নেতৃত্ব

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপিতে তীব্র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। অনেক নেতা সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের সঙ্গে যুক্ত হন, ফলে দলটি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন। প্রথমে ভাইস চেয়ারম্যান, পরে ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন।

বিএনপির সাবেক নেতা অলি আহমেদ জানিয়েছেন, দলকে বাঁচাতেই পরিবারের অনুরোধে তিনি রাজনীতিতে আসেন। তার ঘনিষ্ঠ নেত্রী সেলিমা রহমান বলেন, রাজনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যেও খালেদা জিয়া পারিবারিক দায়িত্ব পালনে কখনো অবহেলা করেননি।

আপোষহীন নেত্রীর উত্থান

খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব নেন সামরিক শাসক এরশাদের শাসনামলে। তার নেতৃত্বে নয় বছরব্যাপী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে ও দলকে রাজনৈতিকভাবে সুসংহত করেন।

১৯৮৩ সালে তিনি সাত দলীয় জোট গঠন করে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। যেখানে আওয়ামী লীগসহ অন্য জোটগুলো এক পর্যায়ে নির্বাচনে অংশ নেয়, সেখানে বিএনপি রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখে। এ কারণেই তিনি ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।

এই আন্দোলনের সময় তিনি তিনবার গ্রেপ্তার হন। গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমেই খালেদা জিয়া বিএনপিকে পুনর্জীবিত করেন।

এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়। খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে নির্বাচন করে সবগুলোতেই জয়ী হন এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।

নির্বাচনের আগে দেওয়া অঙ্গীকার অনুযায়ী, তার নেতৃত্বে পঞ্চম সংসদে রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের বিল উত্থাপন ও সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশে ফিরে আসে সংসদীয় গণতন্ত্র।