ঢামেক শিক্ষার্থী নন্দিনীর করুণ মৃত্যু, শেষ হলো চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন

image 94

ঠিক আট মাস আগে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় জায়গা করে নেয়া নন্দিনী রানী সরকার উচ্ছ্বসিত ছিলেন, কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে যুক্ত ছিল তার বাবার চিন্তাও। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালানো তিনি কীভাবে মেয়েকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করাবেন—এই প্রশ্ন তার মাথায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল। সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন।

কিন্তু এবার সেই মেধাবী নন্দিনী আবারও সংবাদ শিরোনামে এসেছে, এবার হৃদয়বিদারক কারণে। ঝিনাইদহের শৈলকুপায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে মামাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে মদ্যপানে অসুস্থ হয়ে রবিবার (৫ অক্টোবর) ভোরে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নন্দিনী রানী সরকার। তিনি ১৮ বছর বয়সী এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

নন্দিনীর বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের গিলন্ড গ্রামে। দুই বোনের মধ্যে নন্দিনী বড়, ছোট বোন বিনা রানী সরকারও মেধাবী শিক্ষার্থী। চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় নন্দিনী ১৩৩তম স্থানে ছিলেন এবং এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।

জানা গেছে, দুর্গাপূজা উপলক্ষে নন্দিনী ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ভান্ডারীপাড়া গ্রামে নানার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। দশমীর দিন বান্ধবীদের সঙ্গে বিসর্জনের জন্য ঘুরতে গিয়ে তারা মদ্যপান করেন। রাতেই নন্দিনী অসুস্থ হয়ে পড়লে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। কিছুটা সুস্থবোধ করলে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়, কিন্তু পরে আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোররাতে মারা যান তিনি।

নন্দিনীর নানা সঞ্জয় কুমার সরকার জানান, চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে নন্দিনীর মৃত্যু হয়েছে। গণেশ চন্দ্র সরকার বলেন, “ভাতিজি অনেক মেধাবী ছিল, তাকে হারিয়ে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।”

শৈলকুপা থানার ওসি মাসুম খান জানান, তারা ঘটনাটি শুনেছেন, তবে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি এবং থানায় কোনো অভিযোগ জমা পড়েনি।

নন্দিনী ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিনি স্থানীয় গিলন্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক সমাপনীতে জিপিএ-৫, কানিজ ফাতেমা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে জেএসসি-তে জিপিএ-৪.৪৬, এসএসসি-তে জিপিএ-৫ এবং এইচএসসি-তে জিপিএ-৫ অর্জন করেছিলেন। এরপর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় দারুণ সাফল্য পান।

নন্দিনীর সাফল্যে তার বাবা অনিল চন্দ্র সরকার খুশি হলেও জানান, সংসারের আর্থিক সংকট রয়েছে। তিনি ইজিবাইক চালিয়ে দুই মেয়ে, স্ত্রী ও বাবাকে নিয়ে ছয়জনের সংসার চালান। কয়েক বছর আগে অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে তিনি মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন।

মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার নির্দেশে জেলা বিএনপি সভাপতি আফরোজা খানম রিতা এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি তৌহিদুর রহমান আউয়াল নন্দিনীর বাড়িতে গিয়েছিলেন। তারা তাকে মেডিকেলের পড়াশোনার বই ও নগদ অর্থসহায়তা করেছিলেন।

নন্দিনীর স্বপ্ন ছিল ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে দরিদ্র রোগীদের সেবা করা। তিনি বলতেন, “স্কুল ও কলেজে স্যাররা আমাকে বিনা বেতনে পড়িয়েছেন। বই থেকে শুরু করে সব সহায়তা পেয়েছি। আমার বাবার সামর্থ্য নেই এত টাকা দিয়ে পড়াবেন। আমি যেমন দরিদ্র, আরও অনেক দরিদ্র মানুষ আছে যারা বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, আমি তাদের সাহায্য করতে চাই, সেবা দিতে চাই।”

কিন্তু তার অকাল মৃত্যুতে থেমে গেল সেই স্বপ্ন, যে স্বপ্নে তিনি দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসক হয়ে সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।