জাতীয় নির্বাচনের আলোতে সংখ্যালঘুদের আশা ও চিন্তা

image 253

আনাদি সরকার সকালে উঠেই গাছের তুলসী তলায় জল দেন। যশোরের এই অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ধীরে ধীরে খবরের কাগজটি খুলে শিরোনামগুলো চোখ বোলান। জাতীয় নির্বাচন কাছে আসছে, এবং তার মনে একসাথে ভর করে আশা ও ভয়। “ভোট একটি বিষয়, কিন্তু বাংলাদেশ কেমন হবে, সেটাই আসল,” বলেন তিনি। “আমি এমন একটি দেশ চাই, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবারই শান্তিতে থাকা সম্ভব। কেউ শোষিত হবে না, কেউ ভয় পাবে না।”

এই অনুভূতি কেবল আনাদি সরকারের নয়। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে একই সঙ্গে প্রত্যাশা ও উদ্বেগ কাজ করছে। নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে তারা এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন।

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৪ থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত দেশে ২,৬০০টির বেশি ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। উপাসনালয়ে হামলা থেকে শুরু করে হত্যা পর্যন্ত এসব ঘটনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। সংগঠনটি বলছে, নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে নিরাপত্তা উদ্বেগ।

ঢাকায় বসবাসরত মানিক ডি’কস্তা বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেই। ধর্মীয় উগ্রতা বাড়ছে। প্রশ্ন একটাই—সংখ্যালঘু আর রাজনৈতিক কর্মীরা কতটা নিরাপদ থাকবেন?” তার মতে, ধর্ম এবং রাজনীতি আলাদা করতে হবে। “পূজা বা বড়দিনে পুলিশ দিয়ে পাহারা দেওয়া নিরাপত্তা নয়। সেদিনই আসল নিরাপত্তা থাকবে, যখন কোনো পাহারা ছাড়াই উপাসনা করা সম্ভব হবে।”

চট্টগ্রামের বোয়ালখালির অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা যাকোব কুইয়া বলেন, “আমরা চাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের আচরণ হতে হবে সহনশীল এবং মানবিক।”

রাঙামাটির রাজস্থলীতে বসবাস করা বিনিতা ত্রিপুরা বলেন, “আমরা নিরাপদ বাংলাদেশ চাই। আদিবাসী হিসেবে আলাদা নই। আমরা চাই ঐক্য ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ।” উত্তরবঙ্গের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রদীপ হেমব্রম বলেন, “নির্বাচনের সময় আদিবাসীরা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে থাকে। ভূমি দখল ও সহিংসতা বারবার হয়েছে। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা চাই।”

বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করে, প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব দেয় না। সংরক্ষিত আসন ও আলাদা নির্বাচনী ব্যবস্থা দরকার। হিন্দুরা হিন্দুদের ভোটে নির্বাচিত হলে সংঘাত কমবে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শান্তু বড়ুয়া বলেন, “বৌদ্ধ সম্প্রদায়ও সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। নির্বাচন যেন উৎসবের মতো হয়। মৌলিক অধিকার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।” গারো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি থিওফিল নকরেক বলেন, “ভূমির অধিকার ও উন্নয়নের প্রশ্নে আমাদের কথা ভাবতে হবে। সংসদে আদিবাসীদের জন্য কোটা থাকলে বাংলাদেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।”

এই সব কণ্ঠস্বর মিলিয়ে যে ছবি তৈরি হয়, সেখানে ভয় আর আশা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। নিরাপত্তা ছাড়া ভোট অর্থহীন, মর্যাদা ছাড়া নাগরিকত্ব অসম্পূর্ণ, প্রতিনিধিত্ব ছাড়া গণতন্ত্র দুর্বল।

সন্ধ্যা নামার সময় আনাদি সরকার আবার উঠানে এসে বসেন। চারপাশে নীরবতা, দূরে মসজিদের আজান ভেসে আসে। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন।

“আমরা ভোট দেব দায়িত্ব থেকে,” বলেন তিনি, “কিন্তু চাই নির্বাচন হোক শান্তিপূর্ণ। চাই বাংলাদেশ হোক এমন দেশ, যেখানে কেউ সংখ্যালঘু হয়ে ভয় পাবে না।” কাগজ ভাঁজ করে রাখেন তিনি। চোখে তখনও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন—যেখানে মানুষ পরিচয় নয়, মানুষ হিসেবেই নিরাপদ থাকবে।