শিশুদের মৃত্যুর হাহাকার কুতুবদিয়ায়, ১ বছরে ৬০ জনের প্রাণহানি

image 238

কুতুবদিয়ায় শিশুদের ‘ডেথ জোন’: এক বছরে ৬০ শিশুর মৃত্যু

কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় পানিতে ডুবে মৃত্যু যেন শিশুদের জন্য নিয়মিত ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি বাড়ির পাশেই রয়েছে পুকুর, খাল বা ডোবা—যেখানে অসতর্ক মুহূর্তে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। গত এক বছরে অন্তত ৬০ শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে।

উপজেলার মাত্র ছয় ইউনিয়নে সাগর ও নদী ঘেরা। এখানে অসংখ্য খোলা জলাশয়, চিংড়ি ও লবণচাষের খোঁড়া গর্ত এবং বৃষ্টির পানি জমে থাকা ডোবা ছড়িয়ে আছে। শিশুদের খেলার জন্য নিরাপদ জায়গার অভাব থাকায় তারা ঘরের আশপাশে ঘোরাফেরা করে। এক মুহূর্তের অসতর্কতায় ঘটে যাচ্ছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পানিতে ডুবে ৫৩ জন শিশু হাসপাতালে আনা হয়েছে। মাসভিত্তিক মৃত্যু সংখ্যা দেখায় জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৩টি করে, মার্চ ও এপ্রিল ২টি করে, মে ৪, জুন ৬, জুলাই ৫, আগস্ট ৪, সেপ্টেম্বর ৬, অক্টোবর ৪, নভেম্বর সর্বোচ্চ ৯ এবং ডিসেম্বর ৪। এছাড়া আশঙ্কাজনক অবস্থায় আনা দুই শিশু চিকিৎসায় বেঁচে গেছে।

সরকারি হিসাবের বাইরে, প্রত্যন্ত এলাকার স্থানীয় চিকিৎসকদের কাছে অন্তত আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৬০। তুলনামূলকভাবে ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৬, আর ২০১৮ সালে এক বছরে ৮০ শিশু পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পরিবারের অগোচরে বাড়ির পাশের পুকুরে পড়া দুর্ঘটনা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। কুতুবদিয়া স্বেচ্ছাসেবী সমন্বয় ফোরামের সেজাউল করিম মনি বলেন, সচেতনতা বাড়াতে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে প্রচার চালানো হলেও দরিদ্র পরিবারের বাবা-মা জীবিকার তাগিদে ব্যস্ত থাকায় সবসময় শিশুদের নজর রাখা সম্ভব হয় না।

উপজেলার বাড়ির পাশের পুকুরগুলোতে বেড়া নেই, নিরাপত্তা সতর্কবার্তা নেই। লবণচাষ বা মাছচাষের খোঁড়া গর্তে সারাবছর পানি জমে থাকে। এমনকি বাড়ির উঠানে রাখা বড় পানির পাত্রেও শিশুদের দুর্ঘটনা ঘটছে।

পানিতে ডুবে শিশু মারা গেলে থানায় জানাতে হয় এবং ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের অনুমতি নিতে হয়। এতে পরিবারগুলোকে বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল হক জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্ত শেষে অভিভাবকের লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল হাসান বলেন, সরকারি কর্মসূচিতে অভিভাবকদের সচেতন করা হচ্ছে, কিন্তু তিন থেকে চার সন্তানের পরিবারের মায়েরা সবসময় নজর রাখতে পারছেন না। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের দুর্বলতাও একটি কারণ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়ির পাশের পুকুরে বেড়া, শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার জায়গা, অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ এবং কমিউনিটি নজরদারি বৃদ্ধির মাধ্যমে এই মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব।

কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কুতুবদিয়ার অগণিত পুকুর, খাল ও ডোবা শিশুদের জন্য ‘ডেথ জোন’ হিসেবে থেকে যাবে—এমন আশঙ্কা স্থানীয়দের।