‘আই ওয়ান্ট জাস্টিস ফর মাই ফাদার’স মার্ডার’

image 210

বাবার মৃত্যুর গভীরতা এখনও পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেনি ১১ বছরের আজিবা চৌধুরী আজিন। ঢাকার উত্তরার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি শেষ করে সদ্য সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছে সে। অল্প বয়সেই তার জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে। বাবার কথা জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আজিন বলে, “আই ওয়ান্ট জাস্টিস ফর মাই ফাদার’স মার্ডার।”

গত ২২ জানুয়ারি রাজধানীর গুলশানে কনকর্ড গ্রুপের একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে যাওয়া রডের আঘাতে নিহত হন জিই হেলথ কেয়ারের লজিস্টিক ম্যানেজার আশফাকুজ্জামান চৌধুরী (পিপলু)। রোববার (২৫ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ বরুমছড়া গ্রামে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকাচ্ছন্ন পরিবেশ।

আজিন জানায়, প্রতিদিন তার বাবা তাকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। বাবার কাছে কোনো আবদার অপূর্ণ থাকেনি। সে বলে, “এখন আমি এসব চাইবো কার কাছে? আমি চাই, আর কোনো শিশু যেন আমার বয়সে এসে এতিম না হয়।”

বাড়ির পুকুরঘাটে নির্বাক বসে ছিলেন আশফাকুজ্জামানের বাবা, ৮০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নাদেরুজ্জামান চৌধুরী। ছেলের মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আক্ষেপ করে বলেন, “রাস্তায় হাঁটার সময় যদি মানুষের নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়?”

ঘটনার পরদিন ২৩ জানুয়ারি গুলশান থানায় নিহতের শ্বশুর মো. সিরাজুল ইসলাম তালুকদার বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় কনকর্ড গ্রুপের চেয়ারম্যান এস এম কামাল উদ্দিন (৭২), ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার কামাল (৪৫), প্রকল্প ইনচার্জ আল আমিন (৩৮)সহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০–১২ জনকে আসামি করা হয়।

বাদীর অভিযোগ, ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। কনকর্ড গ্রুপ প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ শুরুতে মামলাও নিতে গড়িমসি করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, “তারা শুধু তদন্তের কথা বলছে। কনকর্ড গ্রুপের কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি, এমনকি আমার এতিম নাতনিকে সান্ত্বনা দিতেও আসেনি।”

এ বিষয়ে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসান বলেন, “তদন্ত চলমান রয়েছে। দোষীদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশ কাজ করছে না—এমন অভিযোগ সঠিক নয়।”

অন্যদিকে, কনকর্ড গ্রুপ এক বিবৃতিতে জানায়, দুর্ঘটনাস্থল থেকে তাদের প্রকল্পের দূরত্ব ৪০–৫০ ফুট। তাদের দাবি, পাশের একটি ভবনে কাচ পরিষ্কারের সময় সেখান থেকে মরিচা ধরা একটি রড পড়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে, যা তাদের নির্মাণসামগ্রীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা পুলিশি তদন্তে সহযোগিতার কথাও জানিয়েছে।

ঢাকায় কর্মজীবনে ব্যস্ত থাকলেও গ্রামের সঙ্গে আশফাকুজ্জামানের ছিল গভীর সম্পর্ক। তিনি বরুমছড়া জাগরণী ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বাঁশখালী উপজেলা জামায়াতের শূরা সদস্য নুরুল আমিন সিকদার জানান, ক্লাবের ফুটবল টুর্নামেন্টে পুরস্কার বিতরণের জন্য শুক্রবার বিকেলে নিহতের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল তার। বৃহস্পতিবার রাতের ট্রেনের টিকিটও কাটা হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই লাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাকে। শনিবার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।