
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত বেসরকারিভাবে ২৯৭টি আসনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টিতে জয়ী হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপি দুই দশক পর ফের সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব এখন তার ছেলে তারেক রহমানের কাঁধে। তিনিই নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার পথ সহজ হবে না। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার মতো বড় ধরনের ১০টি চ্যালেঞ্জ তার সামনে রয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির উপর কেন্দ্রীভূত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে যেসব বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, তার মধ্যে রয়েছে—
গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণ
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখা
ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গঠন
রাষ্ট্রের সব স্তর থেকে দুর্নীতি দূর করা
উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান থেকে দেশের সুরক্ষা
কার্যকর, নিরপেক্ষ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম আমলাতন্ত্র গঠন
রাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা
মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলা
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি
নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করে রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা আনা
তাছাড়া কিছু কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের শক্তিগুলো একত্রিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করতে হবে। এতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পথ সুগম হবে এবং দেশে স্থিতিশীলতার বাতাস বইবে।
সিপিবি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, নতুন সরকারকে সব মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। দেশে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি বৃদ্ধির কারণে তারা সরকারকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে। মুক্তিযুদ্ধপন্থী শক্তিগুলোকে একত্রিত করে ঐক্যবদ্ধভাবে এই শক্তির মোকাবিলা করতে হবে। এছাড়া বিদেশি কোনো অনুরোধ যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে, তা অগ্রাহ্য করতে হবে।
প্রাক্তন জনপ্রশাসন সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমলাতন্ত্র পুনর্গঠন। পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনে দলীয়করণের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। সুবিধাবাদী গ্রুপ প্রশাসন দখল করে উন্নয়নমূলক কাজ বাধাগ্রস্ত করেছে। নতুন সরকারকে দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দেশের অর্থনীতি অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। আমদানি-রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকুচিত হয়। এতে লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। নতুন সরকারকে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হবে। ব্যাংক খাতের সংকট ও বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার বিষয়ও বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাটাও গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, নতুন সরকারকে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হবে। সরকারের আয় বৃদ্ধি না হলে অতিরিক্ত টাকা ছাপতে হবে, যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে। কর কাঠামো ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। রেমিট্যান্সের ওপর জোর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক করতে হবে। অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতৃত্বে মন্ত্রণালয় পরিচালনা করা জরুরি।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এম হুমায়ুন কবীর বলেন, নতুন সরকারকে বৈশ্বিক যোগাযোগ সমুন্নত রাখতে হবে। ভিসা জটিলতা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অবস্থান এমনভাবে রাখতে হবে, যাতে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ্বে দেশে প্রভাব না পড়ে।
যদিও চ্যালেঞ্জগুলো বড়, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সম্ভাবনাও ততটাই বড়। ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের উষ্ণ সংবর্ধনা, লাখ লাখ মানুষের সমর্থন এবং নির্বাচনে দলীয় বড় জয় প্রমাণ করেছে, জনগণের প্রত্যাশা ও সমর্থন রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কতটা সফলভাবে এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে।