ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার বাংলাদেশের তরুণরা

ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে এখন নানান ধরনের গ্রাফিতির সমাহার। কোথাও প্রতিবাদের ভাষা, কোথাও হাস্যরস, আবার কোথাও কাব্যিক অভিব্যক্তি। দেয়াল ও করিডোরজুড়ে আঁকা এসব রঙিন চিত্রে ফুটে উঠেছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রতিধ্বনি, যার নেতৃত্বে ছিল জেনারেশন জেড বা জেন-জি। গ্রাফিতির বড় অংশজুড়ে রয়েছে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের নানা দৃশ্য ও বার্তা। সমালোচকদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শাসন ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে।

একসময় তাকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতীক বলা হলেও, দীর্ঘ ক্ষমতাকাল ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি স্বৈরাচারী শাসকে পরিণত হন—এমন ধারণা তৈরি হয় বিরোধীদের মধ্যে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পর তিনি ভারতে চলে যান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকায় এখন ভিন্ন এক দৃশ্য। করিডোরে ঝুলছে চীনা নববর্ষ উপলক্ষে লাল লণ্ঠন, আর নিচের লনে রাজনীতি ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তর্কে মেতে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের অনেকেই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছেন। এ সময়টিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনায় রয়েছে বাংলাদেশ, যেখানে দিল্লি ও বেইজিং নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয়।

শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। তার পতনের তিন দিন পর, ৮ আগস্ট দেশের দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের সহিংসতার ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। জাতিসংঘের হিসাবে, ওই সময়ের সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন, যাদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান। পরে সেই মামলায় শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। তাকে ফেরত পাঠাতে ভারতকে অনুরোধ জানানো হলেও তাতে সাড়া মেলেনি।

দেশের প্রাচীনতম দল আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসছে বিএনপি। একই সঙ্গে ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে।

তবে ক্যাম্পাস ও এর বাইরের স্লোগান কেবল দেশের ভেতরের গণতন্ত্র নিয়েই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেশী দেশের প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধেও কণ্ঠ উঁচু হচ্ছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’—এ স্লোগান এখন দেয়ালচিত্র থেকে শুরু করে পোশাকেও দেখা যাচ্ছে। তরুণদের আলোচনায় বারবার উঠে আসছে ভারতের প্রভাবের বিষয়টি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র মোশাররফ হোসেন বলেন, অনেক তরুণ মনে করেন, ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকে। তাদের অভিযোগ, দিল্লির ভূমিকা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক, যা একসময় মডেল কূটনীতি হিসেবে পরিচিত ছিল, এখন তীব্র অবনতির মুখে।

লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, বাংলাদেশের ভেতরে বাড়তে থাকা ভারতবিরোধী মনোভাব এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যের কঠোরতা—এই দুই মিলিয়ে দিল্লি এখন ঢাকার ক্ষেত্রে চাপে পড়েছে।

অনেকের মতে, শেখ হাসিনার শেষ সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে ভারত সমর্থন করায় ক্ষোভ বেড়েছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে ভারতের অবস্থানও মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এর সঙ্গে সীমান্তে হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা এবং ভারতীয় রাজনীতিক ও গণমাধ্যমের বক্তব্যও যুক্ত হয়েছে। ফলে অনেকের মধ্যে ধারণা জন্মেছে, বাংলাদেশকে সমান সার্বভৌম প্রতিবেশী হিসেবে নয়, বরং ‘পেছনের উঠোন’ হিসেবে দেখা হয়।

এদিকে, ভারতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ, ভিসা সেবা স্থগিত, আইপিএলে বাংলাদেশি ক্রিকেটার নিষিদ্ধ করা এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ সরানোর বিষয়ে অস্বীকৃতিসহ নানা ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা বেড়েছে।

তবু কূটনৈতিক যোগাযোগের কিছু চেষ্টা চলছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে দিল্লি। তবুও সম্পর্কের শীতলতা কাটেনি।

ডেইলি স্টারের উপদেষ্টা সম্পাদক কামাল আহমেদ বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিম্নস্তরে। আগে নিরাপত্তা সহযোগিতা, ট্রানজিট, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ নানা ক্ষেত্রে সম্পর্ক সক্রিয় ছিল, কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।

শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তও জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। অনেকেই আশা করেছিলেন, ভারত তার বাংলাদেশনীতি পুনর্বিবেচনা করবে। কিন্তু হাসিনাকে ফেরত না দেওয়া এবং ভিসা ও বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা বাড়ানোয় বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

ড. ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একমাত্রিক নয়; এটি বহুমাত্রিক ও বাস্তবভিত্তিক। দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী, ভাষা-সংস্কৃতির মিল এবং প্রতিদিনের মানুষের যাতায়াত এই সম্পর্ককে বাস্তবতায় বেঁধে রেখেছে। তবে জনমনে ভারতের প্রতি মনোভাব এখন কঠোর হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের সহিংসতায় বহু তরুণ নিহত হওয়ার পর শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া এবং সেখানে তাকে রাষ্ট্রপ্রধানের মতো মর্যাদা দেওয়ায় মানুষের ক্ষোভ বেড়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় গণমাধ্যমে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে অভিযোগ প্রচার করা হচ্ছে, তা অতিরঞ্জিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দুই হাজারের বেশি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

ড. ইউনূসের বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে রাষ্ট্রভিত্তিক সম্পর্ক থেকে ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক সম্পর্কে রূপ নিয়েছিল। পানি ও সীমান্ত ইস্যুতে সেই অসমতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। মানুষের ধারণা, তাদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার চেয়ে নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থাকে সমর্থনই অগ্রাধিকার পেয়েছে।

ইনকিলাব মঞ্চের কর্মী ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, তাদের দ্বন্দ্ব ভারত সরকারের সঙ্গে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে নয়। তিনি বলেন, ‘ভারত সরকার আমাদের বিরোধী হতে পারে, কিন্তু মানুষ তো মানুষই।’

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ভারত এই অঞ্চলের বড় রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ করলে সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব। তবে সেটি হতে হবে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও বলেন, উভয় দেশের নেতৃত্ব যদি পারস্পরিক সম্মান ও বাস্তবতা মেনে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে, তাহলে গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।