
অনেকের কাছে শেখ হাসিনা স্বৈরাচারের প্রতীক; কেউ তাকে ফ্যাসিস্ট হিসেবে দেখেন, আবার সমর্থকদের কাছে তিনি উন্নয়নের প্রতীক। চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্তও তার প্রভাব ও শক্তি ছিল বিরাট। তবে এই ক্ষমতা এবং অবস্থান সহজে অর্জিত হয়নি। প্রায় চার দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা শেখ হাসিনা দলের সভাপতি থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে উন্নীত হয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘতম সময়ের রাষ্ট্রনেতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।
শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন পিতা শেখ মুজিবর রহমানের মৃত্যুর পর, ধ্বংসপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। ১৯৮১ সালে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ছয় বছরের নির্বাসনের পর ধীরে ধীরে সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেন। ৮০-এর দশকের শেষভাগে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তার দৃঢ় অবস্থান লক্ষ্যণীয়। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে দল হেরে গেলেও ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
২০০৮ সালে এক মেয়াদ পর নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে আবারও ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। ২০০-এর বেশি আসন অর্জন করে আওয়ামী লীগকে অসীম ক্ষমতাধর করে তোলেন। সংবিধানে কাটাছেঁড়া এবং দীর্ঘ মেয়াদ ধরে থাকার ব্যবস্থা তৈরি করে রাজনীতিতে নিজের প্রভাবকে কেন্দ্রীভূত করেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে একের পর এক নির্বাচন জয়ী হন, কখনো বিনা প্রতিদ্বন্দীতায়, কখনো নিজের প্রতিযোগিতার নাটকীয় জয়ে।
২০২৪ সালে জনগণের ক্ষোভ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে মিলিত হয়। কোটার দাবির আন্দোলন দ্রুত রাষ্ট্রের বৈষম্য প্রতিহত করার হাতিয়ার হিসেবে রূপ নেয়। সরকারি নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভ দমন করতে গুলি চালায়, যা কয়েকশো মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়। তবু ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা চালান শেখ হাসিনা।
শেষ পর্যন্ত, জনস্রোতের চাপের মুখে গণভবনে মানুষের আগমণর আগে ভারত চলে যান তিনি। অধ্যাপক ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর জুলাই গণহত্যার বিচার শুরু হয়। শেখ হাসিনা এই মামলার প্রধান আসামি হিসেবে দাঁড়ান। তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহারের বাস্তব চিত্র আদালতের সামনে উঠে আসে।
ইতিহাসে অনেক স্বৈরশাসকের শেষপরিণতি ফাঁসি বা কারাবাস হয়েছে। বর্তমানে শেখ হাসিনা অবস্থান করছেন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। এবার রায়ের পর ট্রাইব্যুনাল ইন্টারপোলের কাছে গেলে তার পরিণতি কী হবে, সেটাই এখন নজরকাড়া বিষয়।