
বাবার কোলে ভর করে নাইছের লড়াই
বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের বিজ্ঞান ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে বসে আছেন নাইছ খাতুন। বাঁ হাতে কলম ধরে, চোখে একাগ্রতা, কপালে ঘাম। চার ঘণ্টার পরীক্ষা চলছে, প্রতিটি লাইন লিখতে যেন পুরো শরীরের শক্তি ঢেলে দিচ্ছেন তিনি। বাইরে চলাফেরা করছে শত শত শিক্ষার্থী, কিন্তু নাইছ এখনো ভরসা করছেন বাবার দুই হাতে। কয়েক মিনিট আগে বাবা নজরুল ইসলাম মেয়েকে কোলে করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে এনেছেন।
২৪ বছর বয়সী নাইছ জন্ম থেকেই দু’টি পা অচল, ডান হাতেও শক্তি নেই। একমাত্র বাঁ হাতই তাঁর ভরসা, আর সেই ভরসাকে সঙ্গী করে উচ্চশিক্ষার পথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
নাইছের পড়াশোনা শুরু হয় ছয় বছর বয়সে ধুনটের স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে। এরপর প্রতিটি ধাপ তিনি বাবার সাহায্যে পার করেছেন। বিশ্বহরিগাছা-বহালগাছা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এসএসসি, ২০১৯ সালে এইচএসসি পাশ করে বর্তমানে ধুনট সরকারি ডিগ্রি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স করছেন। পড়াশোনার জন্য প্রতিটি মুহূর্তে সীমাহীন লড়াই করতে হয় নাইছকে।
বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। কখনো বাবার কাঁধে চড়ে, কখনো সাইকেলের পেছনে করে স্কুলে পৌঁছেছেন। অনার্স পরীক্ষার হলে যেতে হলে ৩০০ মিটার কাঁচা রাস্তা পেরোতে হয়, যা বাবার কোলে চড়ে অতিক্রম করতে হয়। তারপর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় শহরে পৌঁছান এবং দ্বিতীয় তলায় পরীক্ষার হলে পৌঁছে দেন বাবা।
নাইছ বলেন, “বন্ধুরা হেঁটে স্কুল-কলেজে যায়, নিজের মতো করে চলে। কিন্তু আমি চাইলে এক গ্লাস পানি আনতেও পারি না। তখন মনে হয় আমি অনেক বোঝা। তবু হার মানতে চাই না। বাবা যেভাবে আমাকে কষ্ট করে কোলে নিয়ে স্কুল-কলেজে পৌঁছে দিয়েছেন, আমি চাই একদিন এমন কিছু করি যাতে তিনি গর্ব করে বলতে পারেন—এটাই আমার মেয়ে।”
জন্ম থেকে দুই পা ও ডান হাতে সমস্যা থাকলেও নাইছ কখনো থেমে যায়নি। ছয় বছরের মধ্যে পিজি হাসপাতাল থেকে পঙ্গু হাসপাতাল—সব চিকিৎসা বাবার অদম্য চেষ্টা সত্ত্বেও সীমিত অর্থে সম্ভব হয়েছে। এখন তিনি হামাগুড়ি দিতে পারেন, বসিয়ে দিলে এক হাত দিয়ে কাজ করতে পারেন। চিকিৎসকরা বলেছেন, জন্মের সময় কোনোভাবে আঘাত পেয়েছেন। মাঝেমধ্যে ত্বকে সমস্যা বা মুখে ঘা হয়, তবে পড়াশোনায় একটুও প্রভাব পড়ে না।
নাইছের বাবা নজরুল ইসলাম বলেন, “মেয়ে পড়াশোনায় খুব আগ্রহী। সে কখনো হার মানেনি। আল্লাহ যদি আমাকে শক্তি দেন, শেষ ডিগ্রি পর্যন্ত মেয়েকে বয়ে নিয়ে যাব।”
নাইছ শুধু পড়াশোনার মাধ্যমে নয়, নিজের অদম্য মনোবল দিয়ে অন্যদের অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, “মনোবল অটুট রেখে আমি এগিয়ে গিয়েছি। শরীরে জোর নেই, টানা লিখলে হাত ব্যথা হয়, তবু লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। মানুষের বাজে কথা শুনেছি, তবে তাদের জবাব হয়ে উঠেছে পড়াশোনার সাফল্যে।”
সম্প্রতি তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। বাড়িতে সপ্তাহে পাঁচ দিন, প্রায় ৩০ জন ছাত্র-ছাত্রীকে দুই ঘণ্টা পড়ান। বিনিময়ে মাসে পাঁচ হাজার টাকা পান। কম্পিউটারের বেসিক কাজ শিখেছেন, তবে নিজের কম্পিউটার না থাকায় সব কাজ করতে পারছেন না।
ভবিষ্যতে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন নাইছ। তিনি বলেন, “যারা আমার মতো কষ্টে আছে, তারা যেন শিক্ষা থেকে দূরে না সরে যায়। আমি যদি শিক্ষক হতে পারি, তাদের দেখাতে পারব শিক্ষা হলো একমাত্র শক্তি, যা কাউকে প্রতিবন্ধী মনে করে না।”