ভারতকে ট্রানজিট বানিয়ে ইলিশ পাচারের অভিযোগ, রপ্তানি বন্ধ

image 169

ভারত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইলিশ পাচারের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানি। সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) যুগান্তরে এ বিষয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই আর এক কেজি ইলিশও কলকাতায় যায়নি। অথচ এর আগে টানা তিন দিনে বেনাপোল ও আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় ৭০ হাজার কেজি ইলিশ রপ্তানি হয়েছিল।

বেনাপোল ফিশ কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তা আকসাদুল ইসলাম জানান, রবিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত বৈধভাবে এক কেজি ইলিশও সীমান্ত অতিক্রম করেনি। বেনাপোল স্থলবন্দরের এক কর্মকর্তা বলেন, রপ্তানির জন্য রোববার স্থলবন্দরে পৌঁছায় ইলিশবোঝাই দুটি ট্রাক, কিন্তু রহস্যজনক কারণে পরে সিদ্ধান্ত বদলে সেগুলো ফেরত পাঠানো হয়।

প্রথমদিকে রপ্তানি বন্ধের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছিল—দেশের বাজার থেকে বেশি দামে কিনে কম দামে ভারতে রপ্তানির ফলে লোকসান হচ্ছে। তবে খোঁজ নিয়ে বেরিয়ে আসে ভিন্ন তথ্য। জানা যায়, ভারতকে ট্রানজিট বানিয়ে তৃতীয় দেশে ইলিশ পাচারই মূল কারণ। কলকাতায় বাংলাদেশের একাধিক রপ্তানিকারকের মাছের আড়ত ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

২০০৭ থেকে সীমিত রপ্তানি, কিন্তু চলছে পাচার
২০০৭ সালে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হলেও প্রতিবছর দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুমতিতে সীমিত পরিমাণ ইলিশ ভারতে পাঠানো হয়। এবারও ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেয় সরকার। প্রতি কেজির রপ্তানি মূল্য নির্ধারিত হয় সাড়ে ১২ ডলার (১,৫২৫ টাকা)। কিন্তু দেশের বাজারে তখন ইলিশের দাম ছিল কেজিপ্রতি ১,৮০০ থেকে ২,২০০ টাকা। ফলে প্রকাশ্যে রপ্তানিতে লোকসান হলেও, আসলে ভারত হয়ে অন্য দেশে পাচার করে কয়েকগুণ মুনাফা করত একটি সিন্ডিকেট।

কলকাতার একাধিক মাছ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতি কেজি ইলিশ ১,৯০০ থেকে ২,২০০ টাকায় কিনে ভারতে পাঠাতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ২১-২২ ডলার সমপরিমাণ। লোকসানের হিসাব থাকলেও, ওই ইলিশ হিমায়িত করে বিভিন্ন দেশে পুনঃরপ্তানি করা হয় ৪০-৪৫ ডলারে। এতে প্রতি কেজিতে লাভ দাঁড়ায় ২০-২৪ ডলার বা প্রায় ২,৮০০ টাকা।

বাংলাদেশের অন্তত চারজন রপ্তানিকারকের কলকাতায় আড়ত ও ফ্ল্যাট রয়েছে। তাদের মধ্যে নীরব হোসেন টুটুল একাই চারটি লাইসেন্সে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি পান। তার আড়ত ও স্থাপনা রয়েছে হাওড়া, বশিরহাট ও বারাসাতে। অন্যান্য রপ্তানিকারকরাও আত্মীয়-স্বজনের নামে লাইসেন্স নিয়ে ভারত হয়ে পাচারের পথ সহজ করেন।

সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ায় পৌঁছায় পদ্মার ইলিশ
সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি এবং রেস্টুরেন্ট মালিক যুগান্তরকে জানিয়েছেন, স্থানীয় বাজারে পদ্মার ইলিশ সহজেই পাওয়া যায়। তাঁদের ভাষ্য, এসব ইলিশ ভারত হয়ে পাচার হয়ে পৌঁছায় বিদেশি বাজারে।

রপ্তানি বন্ধে রহস্যজনক পদক্ষেপ
যুগান্তরের অনুসন্ধান প্রকাশের পর হঠাৎ করেই রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। শনিবার সেভেন স্টার ফিশ প্রসেসিং করপোরেশনের দুটি ট্রাক ভর্তি ইলিশ বেনাপোল পৌঁছালেও আকস্মিকভাবে ফেরত আনা হয়। প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দাবি করেন, ক্রয়মূল্যের চেয়ে রপ্তানিমূল্য কম হওয়ায় ভারতে পাঠানো হয়নি। তবে বন্দর পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে হঠাৎ ফেরত আনার বিষয়টি রহস্যজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নিজামউদ্দিন বলেন, “রপ্তানিকারকরা ক্রেতা নিশ্চিত করে তারপর বাজার থেকে মাছ সংগ্রহ করেন। বন্দর পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে ফেরত আনার পেছনে অবশ্যই অন্য কারণ রয়েছে। বিষয়টি সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত।”

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি এবায়েদুল হক চান বলেন, “বহু বছর ধরে একটি সিন্ডিকেট এ অপকর্ম চালিয়ে আসছে। এখন বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় রপ্তানি বন্ধ করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”

অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বাংলাদেশে ইলিশের দাম বেশি হওয়ায় আমদানিতে লোকসান হচ্ছিল, তাই আমরাই রপ্তানি বন্ধ করতে বলেছি। তবে প্রথম দুদিনে ৭ হাজার কেজি ইলিশ আমদানি হওয়ার পর হঠাৎ লোকসানের অজুহাত কেন, সে প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে পারেননি।