মৃত্যুর নয় মাস পর ফ্ল্যাট থেকে অভিনেত্রীর গলিত লাশ উদ্ধার

nn 1752220691564 1752220691776

পাকিস্তানের বিনোদন অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।করাচির ডিফেন্স ফেজ-৬ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী হুমাইরা আসগর আলী-এর পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

৮ জুলাই, মঙ্গলবার বিকেলে আদালতের আদেশে ফ্ল্যাট খালি করতে গিয়ে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা ছিল, তার মৃত্যু হয়েছে এক মাস আগে। কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্টে উঠে আসে বিস্ফোরক তথ্য—হুমাইরার মৃত্যু ঘটেছে প্রায় ৯ মাস আগে, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে।মরদেহটি এতটাই বিকৃত ছিল যে, পুলিশের পক্ষে তার পরিচয় শনাক্ত করাই ছিল কঠিন। অবশেষে মোবাইল ফোন ও কিছু ব্যক্তিগত জিনিসপত্র দেখে নিশ্চিত হওয়া যায়—এটি হুমাইরা আসগরের মরদেহ।

হুমাইরা ২০১৮ সাল থেকে করাচির ইত্তেহাদ কমার্শিয়াল এলাকায় একাই বসবাস করছিলেন। ২০২৪ সালের শুরু থেকেই বন্ধ করে দেন ফ্ল্যাটের ভাড়া দেওয়া। বাড়ির মালিক যোগাযোগে ব্যর্থ হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন,
আর তাতেই ফাঁস হয়ে যায় নিঃসঙ্গ এক মৃত্যুর নির্মম সত্য।

করাচি পুলিশ সার্জন ডা. সুমাইয়া সৈয়েদ বলেন—“দেহটি ছিল একেবারে পচে যাওয়া। ভিসেরা পর্যন্ত অটোলাইজড হয়ে গেছে। মরদেহটি একটি কালো অচেনা বস্তুতে পরিণত হয়েছিল।”

মরদেহ উদ্ধারের পরপরই মিডিয়ায় খবর আসে— পরিবার মরদেহ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।এমনকি বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথাও বলা হয়। বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠে সোশ্যাল মিডিয়ায়।সিন্ধুর সংস্কৃতি মন্ত্রী ও গভর্নর পর্যন্ত ঘোষণা দেন—হুমাইরার দাফনের দায়িত্ব সরকারই নেবে। তবে ১০ জুলাই, লাহোরের ছিপা মর্গ থেকে হুমাইরার ভাই নাভিদ আসগর মরদেহ গ্রহণ করেন। তিনি জানান— “আমার মা বলেছিলেন, পচা দেহ তিনি দেখতে পারবেন না। তাই করাচিতেই দাফনের কথা বলেছিলেন। অথচ মিডিয়া সেটাকে বিকৃত করে বলেছে আমরা মরদেহ নিতে চাইনি। আমি কিন্তু এসেছি—বাবাই আমাকে পাঠিয়েছেন।” নাভিদ আরও বলেন— হুমাইরা সাত বছর আগে করাচি চলে যান এবং ধীরে ধীরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে আনেন। গত দেড় বছর ধরে তার কোনো খোঁজ মেলেনি। এমনকি নিজের সঠিক ঠিকানাও পরিবারকে জানাননি।হুমাইরার তারকাজীবন শুরু হয় ২০১৩ সালে মডেলিং দিয়ে।

২০২২ সালে তিনি জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘তামাশা’-তে অংশগ্রহণ করে খ্যাতি অর্জন করেন। কিন্তু এরপর থেকেই ধীরে ধীরে নিজেকে জনজীবন থেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন। সহকর্মীরা বলছেন— হুমাইরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন, এবং দীর্ঘদিন ধরে একাকীত্বে ভুগছিলেন। তার করুণ মৃত্যুতে শোবিজ অঙ্গনে, মিডিয়ায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে শোক ও বিস্ময়ের ঢেউ বয়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন— “একজন মানুষ কতটা একা হলে তার মৃত্যু হয় ৯ মাস আগে, আর কেউ তা জানতে পারে না?”

এই মৃত্যু সমাজকে আরেকবার ভাবিয়ে তুলেছে— একাকীত্ব, মানসিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক বন্ধনের জায়গাগুলো নিয়ে। পুলিশ জানিয়েছে, হুমাইরার মোবাইল ডেটা বিশ্লেষণ ও ফরেনসিক রিপোর্টের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এখনো চলছে। তারা এখনো এটিকে প্রাথমিকভাবে স্বাভাবিক মৃত্যু মনে করলেও, সবদিক থেকেই তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।

হুমাইরার মৃত্যু শুধুই একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি যেন আমাদের সমাজের নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও যোগাযোগহীনতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। হয়তো হুমাইরা চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এমন কিছু প্রশ্ন—যেগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়া আমাদের সমাজের জন্য জরুরি।

যুবায়ের জারীর, নিজস্ব সম্পাদক, হ্যাভেন নিউজ